ছত্তিসগড়ের জঙ্গলে দীর্ঘদিন ধরে যে মাওবাদী প্রভাব ছিল, তা এখন দ্রুত ভাঙছে—এই বার্তাই ফের স্পষ্ট হয়ে উঠল সুকমা থেকে। নিরাপত্তাবাহিনীর টানা অভিযান, শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যু এবং সরকারের আত্মসমর্পণ নীতির চাপে বুধবার একযোগে অস্ত্র নামালেন ২৬ জন মাওবাদী। তাঁদের মধ্যে সাত জন মহিলা সদস্য এবং ১৩ জনের মাথার উপর মোট পুরস্কারমূল্য ছিল ৬৫ লক্ষ টাকা—যা এই আত্মসমর্পণকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
বুধবার সুকমা জেলায় জেলা পুলিশ ও আধাসেনা কর্তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন ওই ২৬ জন। আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কুখ্যাত মাও নেত্রী লালী ওরফে মুচাকি আয়তে লখমু। ২০১৭ সালে কোরাপুট-এ আইইডি বিস্ফোরণে ১৪ জন নিরাপত্তাকর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর নাম উঠে আসে। ওই মামলায় লালীর মাথার দাম ছিল ১০ লক্ষ টাকা।


এছাড়াও, সুকমায় এক মাওবাদী হামলায় ১৭ জন নিরাপত্তাকর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত মেহল লখমাও এদিন আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর মাথার উপর ঘোষণা করা পুরস্কার ছিল ৮ লক্ষ টাকা। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, আত্মসমর্পণকারী প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই একাধিক গুরুতর মামলা ছিল।
ছত্তিসগড় সরকার মাওবাদীদের মূলস্রোতে ফেরাতে ‘লোন ভারাতু’ এবং ‘পুনা মারগেম’-এর মতো পুনর্বাসন প্রকল্প চালু করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় আত্মসমর্পণকারী প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের মতে, এই নীতি ও নিরাপত্তাবাহিনীর ধারাবাহিক চাপের ফলেই সম্প্রতি মাও শিবিরে অস্ত্র ছাড়ার প্রবণতা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-এর ঘোষণা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে দেশ থেকে মাওবাদ নির্মূলের লক্ষ্য নিয়েই মাওবাদী-অধ্যুষিত এলাকায় অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। চলতি বছরেই ছত্তিসগড়ে নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন একাধিক শীর্ষ মাওবাদী নেতা।


নিহতদের তালিকায় রয়েছেন মাওবাদী সাধারণ সম্পাদক নাম্বালা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজু, পলিটব্যুরো সদস্য রামচন্দ্র রেড্ডি ওরফে চলপতি, তাঁর স্ত্রী রবি ভেঙ্কট লক্ষ্মী চৈতন্য ওরফে অরুণা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নরসিংহচলম ওরফে সুধাকর এবং পিএলজিএ-র শীর্ষ কমান্ডার মাধভী হিডমা।
মাওবাদী সংগঠনের ভিত যে ক্রমশ ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে, তার আরেকটি বড় ইঙ্গিত মিলেছে গড়চিরৌলি থেকে। সেখানে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস-এর উপস্থিতিতে আত্মসমর্পণ করেন নিহত মাওবাদী নেতা কিষেণজির ভাই মাল্লোজুলা বেণুগোপাল রাও ওরফে ভূপতি ওরফে সোনু। সংগঠনের ‘তাত্ত্বিক মস্তিষ্ক’ হিসেবে পরিচিত এই নেতার আত্মসমর্পণ মাও শিবিরে বড়সড় মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, একদিকে শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যু, অন্যদিকে ধারাবাহিক আত্মসমর্পণ—লাল করিডরে মাওবাদী সংগঠনের অস্তিত্ব সংকট এখন আর আড়াল করা যাচ্ছে না।







