ভোটের আগেই কি প্রশ্নের মুখে পড়ছে ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা? বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সেই আশঙ্কাই ফের সামনে আনলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পাঠানো সাড়ে তিন পাতার এক চিঠিতে তিনি একগুচ্ছ গুরুতর অভিযোগ তুলে জানান, এই অনিয়ম চলতে থাকলে বহু বৈধ ভোটার তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার হারাতে পারেন—যার ফলে তৈরি হতে পারে ‘অপূরণীয় ক্ষতি’।
এর আগেও ২০ নভেম্বর ও ২ ডিসেম্বর এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ জানিয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি লিখেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। শনিবার তৃতীয় বার সেই অভিযোগই আরও বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরলেন তিনি। মমতার অভিযোগ, এসআইআর কার্যকর করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন এক রাজ্যের জন্য এক নিয়ম, অন্য রাজ্যের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন নিয়ম প্রয়োগ করছে।
চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ টানেন। তাঁর দাবি, বিহারে বংশতালিকাকে (Family Tree) বৈধ পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে, অথচ পশ্চিমবঙ্গে তা মানা হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, এই সংক্রান্ত নির্দেশ কোনও প্রথাগত বিজ্ঞপ্তি বা বিধিবদ্ধ আদেশে নয়, হোয়াট্সঅ্যাপ মারফত দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁর। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “কখনও কখনও কমিশনের নির্দেশই পরস্পর বিরোধী হয়ে উঠছে।”
এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির অপব্যবহারের অভিযোগও তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক (ERO)-দের অনুমতি বা অজ্ঞাতসারে কমিশনের আইটি সিস্টেম ব্যবহার করে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। অথচ জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী, ইআরও-র অনুমোদন ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া আইনসিদ্ধ নয়। এই ধরনের কোনও বেআইনি কাজ হয়ে থাকলে তার সম্পূর্ণ দায় নির্বাচন কমিশনের উপরেই বর্তাবে বলে চিঠিতে স্পষ্ট করেছেন মমতা।
শুনানি প্রক্রিয়া নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, নির্দিষ্ট কারণ না জানিয়েই ভোটারদের শুনানিতে ডাকা হচ্ছে। ফলে ভোটারদের মনে অকারণে ভয় তৈরি হচ্ছে এবং অনেকেই কার্যত হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। কোথাও নামের বানান ভুল, কোথাও বয়সের সামান্য ফারাক—এই কারণ দেখিয়ে ভোটারদের হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ। আরও গুরুতর অভিযোগ হল, শুনানির সময় কোন কোন নথি প্রয়োজন, তা আগাম জানানো হচ্ছে না এবং নথি জমা নেওয়ার পর কোনও রসিদ বা প্রমাণপত্রও দেওয়া হচ্ছে না।
শুনানিকেন্দ্রে বুথ লেভেল এজেন্ট (BLA)-দের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাড়ি বাড়ি এনুমারেশন পর্বে বিএলএ-রা সক্রিয় ভাবে কাজ করলেও শুনানির সময় তাঁদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। মমতার মতে, ভোটকেন্দ্রে যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পোলিং এজেন্টরা স্বচ্ছতা রক্ষায় উপস্থিত থাকেন, ঠিক তেমনই শুনানি প্রক্রিয়াতেও বিএলএ-দের থাকা প্রয়োজন। তাঁদের বাদ দেওয়ায় গোটা এসআইআর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে মত তাঁর।
সবশেষে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, কোনও রকম পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু করে দেওয়া হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। এমনকি কমিশনের নিযুক্ত মাইক্রো-অবজার্ভারদেরও এই ধরনের কাজের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই এবং রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় না করেই তাঁরা কাজ চালাচ্ছেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী।



