অর্ক সানা: দিল্লির এজলাসে কয়েক মিনিটের উপস্থিতি—আইনি ফলের আগেই রাজনৈতিক বার্তায় রূপ নিল। সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দৃশ্যপট তৈরি করলেন, তাতে তাৎক্ষণিকভাবে লাভের পাল্লা তাঁর দিকেই ঝুঁকেছে। এসআইআর মামলার বিচার ভবিষ্যতের বিষয় হলেও, বুধবারের দিনে রাজনীতির ময়দানে যে আবেগ, আত্মবিশ্বাস ও লড়াইয়ের ছবি পৌঁছে গেল, সেটাই ছিল আসল সাফল্য—আর সেই সাফল্যের ব্যাখ্যা খুঁজতেই এখন একাধিক পথে হাঁটছে রাজ্য বিজেপি।
মমতার রাজনীতিতে তাত্ত্বিক বিতর্ক কখনও মুখ্য হয়নি। মাঠে নেমে, ব্যক্তিগত উপস্থিতিতে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে ঘোরানোই তাঁর চেনা কৌশল। সর্বোচ্চ আদালতের এজলাসে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। ‘রাজ্যবাসীর অধিকার’ রক্ষার বার্তা দিয়ে তিনি যে রাজনৈতিক ইমেজ নির্মাণ করলেন, তাতে তৃণমূল শিবিরে উচ্ছ্বাস স্বাভাবিক। শুনানি শেষ হওয়ার আগেই সমাজমাধ্যমে সেই আখ্যান ছড়িয়ে পড়ে।

বিপরীতে, বিজেপি প্রথমে নেয় ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’-এর পথ। শুনানি চলাকালীন প্রকাশ্য মন্তব্য এড়িয়ে যায় তারা। কিন্তু পর্ব শেষ হতেই শুরু হয় তথ্যভিত্তিক পাল্টা ব্যাখ্যা। আদালতে হওয়া সওয়াল-জবাবের নির্দিষ্ট অংশ কেটে ভিডিয়ো পোস্ট করে বিজেপির যুক্তি—আইনি বাস্তবতা আবেগের গল্পকে ছাপিয়ে যাবে। বিশেষ করে আধার কার্ড ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলা হয়, কমিশন নির্দেশ অমান্য করেনি—এ কথা আদালতই স্পষ্ট করেছে।
রাজ্য বিজেপির বক্তব্যকে সামনে আনেন শমীক ভট্টাচার্য ও সুকান্ত মজুমদার। তাঁদের কটাক্ষ—পশ্চিমবঙ্গে বিরোধীদের গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত, সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মুখে দিল্লির এজলাসে ‘গণতন্ত্র বাঁচানো’র আবেদন রাজনৈতিক দ্বিচারিতা। আদালতে সীমিত সময় পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী রাজনৈতিক ভাষণ দিয়েছেন—এই অভিযোগও তোলা হয়। বিজেপির দাবি, এই মামলাই নাকি ভবিষ্যতে রাজ্য সরকারের অস্বস্তি বাড়াবে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই ব্যাখ্যা কি আপাতত তৈরি হওয়া আবেগকে ম্লান করতে পেরেছে? বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আদালত থেকে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর স্বস্তির ভঙ্গি, তাঁর বক্তব্য এবং তৃণমূলের ‘জয়’ উদ্যাপন—সব মিলিয়ে বুধবার পর্যন্ত জনমানসে এক শক্ত বার্তা পৌঁছেছে। আইনি যুক্তিতে বিজেপি স্বস্তি খুঁজলেও, রাজনৈতিক অপটিক্সে তারা পিছিয়েই পড়েছে—এ কথা একান্ত আলাপচারিতায় মানছেন দলেরই কেউ কেউ।


বিজেপির একাংশের ধারণা, এই উচ্ছ্বাস ক্ষণস্থায়ী। সোমবার কমিশনকে যে তথ্য আদালতে জমা দিতে হবে, তার পরেই নাকি সমীকরণ বদলাবে। কিন্তু রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক আবেগই অনেক সময় দীর্ঘ ছাপ ফেলে। দিল্লির এজলাসে দাঁড়িয়ে সেই আবেগের ছবি নির্মাণে মুখ্যমন্ত্রী সফল—এটাই আজকের বাস্তবতা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মামলার আইনি ভবিষ্যৎ এখনও খোলা। কিন্তু রাজনৈতিক বর্তমানের বিচারে, সুপ্রিম কোর্টের দিনটি দিদির পক্ষেই গেল। আর সেই কারণেই রাজ্য বিজেপিকে এখন একাধিক ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হচ্ছে—অস্বস্তি কাটানোর চেষ্টা হিসেবে।








