বাবার নিথর দেহ মর্গে, আর হাতে কলম—একই দিনে জীবনের সবচেয়ে বড় শোক আর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মাধ্যমিক পরীক্ষার সকালে এমনই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হল পূর্ব বর্ধমানের এক কিশোরী। পথ দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েও ভেঙে না পড়ে, চোখের জল মুছে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে গেল নাসিমা খাতুন। জীবনের অঙ্ক এলোমেলো হয়ে গেলেও, পড়াশোনার অঙ্কে হার মানতে চায়নি সে—বাবার স্বপ্নকেই সম্বল করে পরীক্ষা দিল।
গলসির শিড়রাই গ্রামের বাসিন্দা নাসিমা শিড়রাই আলিজান মল্লিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। তার পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল ইরকোনা উচ্চ বিদ্যালয়ে। রবিবার গভীর রাতে আদরাহাটিতে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তার বাবা শেখ মজনুরের। হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় পিছন থেকে একটি গাড়ির ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। রাতেই খবর পৌঁছয় বাড়িতে। কান্নায় ভেঙে পড়ে পরিবার। গলসি থানার পুলিশ দেহ উদ্ধার করে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
সারা রাত বিনিদ্র অবস্থায় কাটে নাসিমার। শোক আর অনিশ্চয়তার মাঝেই ভোরে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয় সে—পরীক্ষা দেবে। বাবার দেহ মর্গে রেখেই মাসতুতো দাদার সঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্রে যায় নাসিমা। অঙ্কের খাতা জমা দিয়ে বেরিয়েই আর নিজেকে সামলাতে পারেনি। কান্নাভেজা গলায় বলে, “বাবা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়াচ্ছিলেন। পরীক্ষা না দিলে বছরটা নষ্ট হয়ে যেত। বাবার কথাই মনে করে পরীক্ষা দিয়েছি।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিজুল মণ্ডল নাসিমার মানসিক দৃঢ়তার প্রশংসা করে বলেন, “এত বড় শোকের মধ্যেও যে সাহস ও স্থিরতা সে দেখিয়েছে, তা বিরল। এই কঠিন সময়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ তার পাশে রয়েছে।” নাসিমার বাকি পরীক্ষাগুলি নির্বিঘ্নে দেওয়ার জন্য সব রকম সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
গ্রামবাসীদের কথায়, গরু নিয়ে পাত্রহাটি গিয়েছিলেন মজনুর। বাড়ি ফিরতে আর সামান্য পথ বাকি ছিল। এক মুহূর্তে সব শেষ হয়ে যায়। তবু মেয়ের এই দৃঢ়তা আজ গোটা গ্রামের গর্ব। বাবার শেষকৃত্য হয়েছে ময়নাতদন্তের পর রাতে—আর তার আগে, বাবার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে কলম ধরেছিল মেয়ে।








