‘আমি হট্টগোল পছন্দ করি না, দিন অগোছালো হলে মানিয়ে নিতে পারি না’, বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার মেসির

ভারত সফরের পর প্রথম সাক্ষাৎকারে লিয়োনেল মেসির স্পষ্ট বার্তা—হট্টগোল ও অগোছালো দিন তাঁর অপছন্দ। যুবভারতী কাণ্ডের ব্যাখ্যা মিলছে কি তাঁর কথাতেই?

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

যুবভারতী কাণ্ডের পর দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে অবশেষে মুখ খুললেন লিওনেল মেসি। ভারত সফর শেষ হওয়ার প্রায় এক মাস পরে দেওয়া প্রথম পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারেই আর্জেন্টিনার মহাতারকা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন—হট্টগোল, ভিড় আর অগোছালো পরিস্থিতি তাঁর একেবারেই অপছন্দ। প্রতিটি দিন তিনি পরিকল্পনা করে কাটান, সেই ছকে হঠাৎ ছেদ পড়লেই মানসিক ভাবে প্রভাবিত হন। আপাত ভাবে সাধারণ এই মন্তব্যের মধ্যেই অনেকের কাছে যুবভারতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।

আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল Luzu TV-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি ভারত সফর বা যুবভারতী কাণ্ডের প্রসঙ্গ নিজে থেকে তোলেননি। প্রশ্নও করা হয়নি। তবু তাঁর কথায় বারবার উঠে এসেছে ‘হট্টগোল’ এবং দৈনন্দিন ছন্দ ভেঙে যাওয়ার অস্বস্তির কথা—যা অনেকের মতে, কলকাতায় তাঁর অভিজ্ঞতার সঙ্গেই অদ্ভুত ভাবে মিলে যাচ্ছে।

সাক্ষাৎকারে মেসি অকপটে বলেন, তিনি একাকিত্ব ভালোবাসেন। ইন্টার মায়ামি-র অধিনায়ক বলেন, “আমি একটু অদ্ভুত। একা থাকতে খুব পছন্দ করি। একাকিত্ব উপভোগ করি। এমনকি বাড়িতে তিন সন্তান থাকায় যে স্বাভাবিক হট্টগোল তৈরি হয়, সেটাও কখনও কখনও আমাকে ক্লান্ত করে দেয়। তখন একা থাকার প্রয়োজন হয়।” তাঁর মতে, প্রতিটি দিন একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় চলে। হঠাৎ কোনও ঘটনা সেই ছক ভেঙে দিলে তা মানিয়ে নিতে তাঁর সমস্যা হয়।

মেসির এই বক্তব্যের সঙ্গে ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতীতে তাঁর সফরের ঘটনা মিলিয়ে দেখলে অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলে। সেদিন আচমকাই স্টেডিয়াম ছেড়ে বেরিয়ে যান মেসি। তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা দ্রুত তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যান। এর পরেই গ্যালারিতে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। প্রচুর টাকা দিয়ে টিকিট কেটেও মেসিকে সামনে থেকে দেখতে না পেয়ে ক্ষুব্ধ দর্শকেরা চেয়ার, জলের বোতল ছোড়া শুরু করেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে সফর কার্যত ভেস্তে যায়।

ঘটনার অভিঘাতে মাঝপথ থেকেই ফিরে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে তিনি প্রকাশ্যে মেসি ও দর্শকদের কাছে ক্ষমা চান এবং বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের নির্দেশ দেন। দ্রুত গ্রেফতার করা হয় মেসি সফরের আয়োজক শতদ্রু দত্তকে, যিনি এখনও পুলিশি হেফাজতেই রয়েছেন। ওই ঘটনার পর রাজ্যের ক্রীড়া দফতরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। যুবভারতীতে মেসির পাশে দীর্ঘ সময় তাঁকেই দেখা যাওয়ায় প্রশাসনিক অস্বস্তিও বাড়ে।

সাক্ষাৎকারে মেসি তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, কোচ হওয়ায় তাঁর কোনও আগ্রহ নেই। বরং ক্লাব মালিক হওয়ার ইচ্ছাই তাঁর বেশি। লক্ষ্য—তৃণমূল স্তর থেকে নতুন ফুটবলার তৈরি করা। সেই লক্ষ্যে তিনি ইতিমধ্যেই বন্ধুবর লুইস সুয়ারেজ-এর সঙ্গে উরুগুয়ের চতুর্থ ডিভিশনের ক্লাব দেপোর্তিভো এলএসএম-এর মালিক হয়েছেন। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির লক্ষ্যে মায়ামিতে শুরু করেছেন অনূর্ধ্ব-১৬ প্রতিযোগিতা ‘মেসি কাপ’।

সমাজমাধ্যম নিয়েও নিজের বিরক্তির কথা গোপন রাখেননি মেসি। তাঁর অভিযোগ, সেখানে এমন অনেক কথা লেখা হয় যার সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই। সব কিছুর জবাব দেওয়া সম্ভব নয় বলেই তিনি অনেক সময় চুপ থাকেন। প্রযুক্তি প্রসঙ্গে মেসি বলেন, তিনি চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুল ব্যবহার করেন না। “বিরোধিতা করি না, তবে এখনও সড়গড় হয়ে উঠিনি,” বলেন তিনি। জানান, এই ধরনের প্রযুক্তিতে তাঁর স্ত্রী আন্তোনেলা অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ।

এই মুহূর্তে পুরোপুরি ফুটবলেই মন দিয়েছেন মেসি। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর পর আগামী মরসুমের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত তিনি। ভক্তদের আশা, আসন্ন বিশ্বকাপে ফের আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে তাঁকেই দেখা যাবে—এই বার হয়তো আরও পরিণত, আরও সংযত এক মেসিকে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত