কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদের মূলোৎপাটনে আরও একধাপ এগোল ভারতীয় সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন মহাদেব’-এর মাধ্যমে এক সাহসী অভিযানে তারা নিকেশ করেছে পহেলগাঁও হামলার মূল অভিযুক্ত তিন পাকিস্তানি জঙ্গিকে। সেনার সুনির্দিষ্ট কৌশল এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত এই অভিযান শেষপর্যন্ত সফল হয়েছে।
গোপন সুড়ঙ্গই কাল হলো জঙ্গিদের
সূত্র অনুযায়ী, ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে হামলার পরে এই তিন জঙ্গি— সুলেমান, আফগানি ও জিব্রান— গা-ঢাকা দেয় কাশ্মীরে। সেনার গোয়েন্দারা জানতে পারেন, এই জঙ্গিরা পাকিস্তানে ফেরার জন্য একটি গোপন পথ ও সুড়ঙ্গ ব্যবহার করতে পারে। সেই তথ্যের উপর ভিত্তি করে সেনাবাহিনী এক অভিনব কৌশল নেয়।
জঙ্গিদের ফাঁদে ফেলতে কয়েকটি গোপন সুড়ঙ্গ চিহ্নিত করে সেগুলি কৌশলে খুঁড়ে ফেলা হয়, যাতে বৃষ্টির জলে মুখ ঢেকে যায়। ফলে জঙ্গিরা সেই সুড়ঙ্গ ব্যবহার করতে পারেনি। পালানোর সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় তিন মাস তারা কাশ্মীরে গা ঢাকা দিয়ে থেকেও আর বাইরে বেরোতে পারেনি।
আট কিলোমিটারের বিশেষ নজরদারি
পহেলগাঁও থেকে পাকিস্তান ফেরার জন্য যে আট কিলোমিটার দীর্ঘ রুট ব্যবহারের সম্ভাবনা ছিল, সেটি সেনা আগে থেকেই চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়িয়ে দেয়। এই রুটে কড়া নজরদারি এবং গোয়েন্দা নজরদারির কারণে জঙ্গিরা বুঝে যায়, পালানোর চেষ্টা করলে ধরা পড়ে যাবে।
ফরেন্সিকে মিলল ৯৯ শতাংশ প্রমাণ
তিন জঙ্গিকে নিকেশ করার পরে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একে৪৭ ও এম৯ পিস্তল বিশেষ বিমানে পাঠানো হয় চণ্ডীগড়ে। গুলির খোল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পহেলগাঁও হামলায় ব্যবহৃত গুলির খোলের সঙ্গে ৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে। এছাড়া অহমদাবাদ থেকেও বিশেষ ফরেন্সিক যন্ত্র আনা হয়, যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে এই তিনজনই হামলার সঙ্গে যুক্ত।
‘অপারেশন মহাদেব’ চালায় যৌথ বাহিনী
শ্রীনগরের কাছে জঙ্গিদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতেই সেনাবাহিনী, সিআরপিএফ এবং জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালায়। সোমবার সংসদে যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে বক্তব্য রাখছিলেন, ঠিক তখনই এই অভিযান চলছিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক গুলির লড়াইয়ে তিন জঙ্গিকেই হত্যা করা হয়। তাদের কাছ থেকে রাইফেল, গ্রেনেড-সহ একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের সামনে মৃতদেহগুলি শনাক্ত করতে আনা হয়, যেখানে তারা নিশ্চিত করেন এই জঙ্গিরাই পহেলগাঁও হামলায় জড়িত।
কাশ্মীরি দালালদের ভূমিকা
অভিযোগ উঠেছে, কাশ্মীরের কিছু স্থানীয় ব্যক্তি এই জঙ্গিদের আশ্রয় ও সাহায্য করছিল। বাহিনী তাদের চিহ্নিত করেছে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও উঠেছে।
শাহের তৎপরতা
অভিযানের পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে এই বিষয়টি তদারকি করেন। ফরেন্সিক ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে রাতভর যোগাযোগ রেখে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হন যে নিহত জঙ্গিরাই পহেলগাঁওয়ের মূল অভিযুক্ত।
এই সফল অভিযান ভারতীয় সেনার কৌশল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রযুক্তির যুগলবন্দির স্পষ্ট উদাহরণ। গোপন সুড়ঙ্গ বন্ধ করার মতো পরিকল্পনা জঙ্গিদের পালানোর সব পথ বন্ধ করে দেয়। কাশ্মীরের শান্তি বজায় রাখতে এ ধরনের অভিযান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সেনার এই সাফল্য কেবল তিন জঙ্গিকে নিকেশ করল না, ভবিষ্যতের অনেক হামলাও প্রতিহত করল।








