দু’বছরের মধ্যে নতুন জেলা কাকদ্বীপ! সুন্দরবনের দ্বীপ জুড়তে ‘মডেল’ পরিকল্পনা, CAA নিয়েও বড় বার্তা

কাকদ্বীপকে দু’বছরের মধ্যে নতুন জেলা করার ঘোষণা শুভেন্দু অধিকারীর। সুন্দরবনের দ্বীপ সংযোগ, বাঁধ মেরামতি ও মুড়িগঙ্গা সেতুর পাশাপাশি CAA শংসাপত্র দ্রুত দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রশাসনিক মানচিত্রে বদলের ইঙ্গিত দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার কাকদ্বীপে সরকারি কর্মসূচি থেকে তিনি ঘোষণা করেছেন, আগামী দু’বছরের মধ্যে কাকদ্বীপকে নতুন জেলা করা হবে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের দ্বীপগুলিকে যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্ত করে ‘সুন্দরবন মডেল’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA)-এর অধীনে শংসাপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক ও কাকদ্বীপের মহকুমাশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

কাকদ্বীপ স্টেডিয়ামে সুন্দরবন বিষয়ক দফতরের উদ্যোগে আয়োজিত জনপরিষেবা কর্মসূচিতে এই ঘোষণা করেন শুভেন্দু। বর্তমানে কাকদ্বীপ একটি মহকুমা। এর আওতায় রয়েছে কাকদ্বীপ, নামখানা, পাথরপ্রতিমা ও সাগর—এই চারটি ব্লক। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাকদ্বীপকে পৃথক জেলা করা হবে। তবে এই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সময় লাগবে।

সুন্দরবনের উন্নয়ন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, দ্বীপাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলি রয়েছে, সেগুলি কমাতে দ্বীপগুলিকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর ঘোষিত ‘সুন্দরবন মডেল’-এর লক্ষ্য, এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও উন্নয়নমূলক কাজকে আরও সুসংহত করা। তবে এই পরিকল্পনার বিস্তারিত রূপরেখা, প্রকল্পের পর্যায় এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনও স্পষ্ট নয়।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ও কাজের অগ্রগতির হিসাবও তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, আগের সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সুন্দরবন এলাকার জন্য ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করলেও খরচ হয়েছিল ২০০ কোটি টাকা। ওই খরচের বড় অংশ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগও করেন তিনি। বর্তমান সরকার আট মাসের বাজেটে ১২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে বলে জানান শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ৫৫৩টি কাজের টেন্ডার হয়েছে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ২৬৫০টি কাজ হাতে নেওয়া হবে। এই পরিসংখ্যান ও দুর্নীতির অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের ভিত্তিতে জানানো হচ্ছে; স্বাধীনভাবে যাচাই করা হিসাব হিসেবে নয়।

সুন্দরবনের নদীবাঁধ মেরামতির জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, মুড়িগঙ্গা নদীর উপর সেতু ২০২৯ সালের মধ্যে উদ্বোধন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেতুটি চালু হলে সাগরদ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ আরও সহজ হতে পারে। তবে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণ সম্পূর্ণ করা কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী কাজের উপর।

কাকদ্বীপের সভা থেকে CAA শংসাপত্র নিয়েও প্রশাসনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু। বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় বা জীবনরক্ষার কারণে ভারতে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ নয়, ‘শরণার্থী’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক এবং কাকদ্বীপের মহকুমাশাসককে দ্রুত শংসাপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করতে বলেছেন। ডিসেম্বরের ১০ তারিখের পর সাগরে যাওয়ার এবং জানুয়ারিতে গঙ্গাসাগর মেলার প্রস্তুতি পরিদর্শনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তার আগেই যোগ্য আবেদনকারীরা যাতে শংসাপত্র পান, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনকে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

শুভেন্দুর বক্তব্য, CAA শংসাপত্র পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে নাগরিকত্বের শংসাপত্র পাওয়া এবং ভোটার তালিকায় নাম ওঠা পৃথক আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত যোগ্যতা ও যাচাইয়ের নিয়মও প্রযোজ্য হবে।

সভায় পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক হিংসার ঘটনাগুলিও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। যাঁরা সেই সময় আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের নতুন করে এফআইআর দায়ের করার পরামর্শ দেন তিনি। ভোট-পরবর্তী হিংসা এবং আমফান ও মনরেগা প্রকল্পের অর্থ নিয়ে ওঠা অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগ ও প্রতিশ্রুতি; সংশ্লিষ্ট মামলাগুলিতে কারও দায় নির্ধারণ হবে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

কাকদ্বীপকে জেলা করার ঘোষণা এবং সুন্দরবনের দ্বীপগুলিকে যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রশাসনিক কাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নতুন জেলা গঠনের জন্য সরকারি বিজ্ঞপ্তি, সীমানা নির্ধারণ, দফতর ও কর্মী পরিকাঠামো তৈরি-সহ একাধিক ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পর এখন নজর থাকবে পরিকল্পনাগুলি কীভাবে সরকারি সিদ্ধান্ত ও বাস্তব প্রকল্পে রূপ পায়, তার দিকে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর