‘রাম যাদবকে মারল’, বাবার নাম ‘বি.কম’! উত্তরপ্রদেশের ভোটার তালিকায় ১৫৮টি ভুল, ব্যাখ্যা তলব কমিশনের

উত্তরপ্রদেশ বিধান পরিষদের ভোটার তালিকায় অন্তত ১৫৮টি এন্ট্রিতে নাম ও পারিবারিক পরিচয়ের গরমিল। সফটওয়্যারের অনুবাদজনিত ত্রুটি ও যাচাইয়ের গাফিলতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে ব্যাখ্যা তলব।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

উত্তরপ্রদেশের বিধান পরিষদ নির্বাচনের ভোটার তালিকায় ‘রাম নে যাদব কো মারা’ কিংবা বাবার নামের জায়গায় ‘বি.কম’-এর মতো অদ্ভুত এন্ট্রি ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অন্তত ১৫৮টি নাম বা পারিবারিক পরিচয়ে গরমিলের কথা স্বীকার করেছে উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর। দফতরের ব্যাখ্যা, অনলাইনে ভোটার তালিকা তৈরির সময় ইংরেজি নাম হিন্দিতে লেখার বদলে কিছু ক্ষেত্রে সফটওয়্যার নামের অর্থ অনুবাদ করে ফেলেছে। পাশাপাশি, ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা যাচাই না করার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

বিতর্কের সূত্রপাত উত্তরপ্রদেশ বিধান পরিষদের ১১টি আসনের ভোটার তালিকা প্রকাশ্যে আসার পর। পাঁচটি স্নাতক এবং ছ’টি শিক্ষক নির্বাচনী কেন্দ্রের জন্য তৈরি তালিকায় একাধিক ভোটারের নাম ও তাঁদের বাবা বা স্বামীর নামের জায়গায় অস্বাভাবিক শব্দ দেখা যায়। শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, এই আসনগুলিতে ভোটগ্রহণ হয়েছে। ভোটার তালিকায় এমন ভুল কীভাবে থেকে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

একটি এন্ট্রিতে ‘রাম নে যাদব কো মারা’—অর্থাৎ ‘রাম যাদবকে মারল’—নামটি দেখা যায়। অন্য একটি ক্ষেত্রে ‘রাম নে শর্মা কো মারা’ লেখা হয়েছে। কোথাও আবার ভোটারের বাবার নামের জায়গায় রয়েছে ‘বি.কম’। এই ধরনের তথ্য সামনে আসার পর ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নবদীপ রিণওয়া জানিয়েছেন, মোট ১৪ লক্ষ ৮১ হাজার ৩১০টি এন্ট্রির মধ্যে অন্তত ১৫৮টিতে নাম বা পরিবারের সদস্যের পরিচয় সংক্রান্ত গরমিল ধরা পড়েছে। নির্বাচনী দফতরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কয়েকটি ক্ষেত্রে সফটওয়্যারের প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের যাচাইয়ের অভাব এই ভুলের কারণ।

সমস্যাটি বোঝাতে ‘রামহিত যাদব’ নামের উদাহরণ দিয়েছে নির্বাচনী দফতর। ইংরেজিতে নামটি ভুল করে ‘Ram hit Yadav’ হিসেবে লেখা হলে সফটওয়্যার ‘hit’ শব্দটিকে নামের অংশ হিসেবে না দেখে তার অর্থ ধরে অনুবাদ করেছে। ফলে হিন্দিতে নামটি দাঁড়িয়েছে ‘রাম নে যাদব কো মারা’। অর্থাৎ, নামের উচ্চারণ অনুযায়ী হিন্দি হরফে লেখার বদলে সফটওয়্যার শব্দের অর্থ অনুবাদ করায় সম্পূর্ণ ভিন্ন বাক্য তৈরি হয়েছে।

তবে সব ভুলের দায় সফটওয়্যারের উপর চাপায়নি প্রশাসন। ভোটারের বাবার নামের জায়গায় ‘বি.কম’ থাকার ঘটনাকে মানবিক ভুল বা দায়িত্বে অবহেলার সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনী দফতরের বক্তব্য, সফটওয়্যারে ভুল এন্ট্রি সংশোধনের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট স্তরে তথ্য ঠিকমতো যাচাই না করায় কিছু ভুল চূড়ান্ত তালিকাতেও থেকে যায়।

এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলাশাসকদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। বিধান পরিষদের নির্বাচনী তালিকায় বিভাগীয় কমিশনারেরা ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ERO) এবং সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসকেরা অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (AERO) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভোটার তালিকা নির্ভুল রাখার দায়িত্ব তাঁদের প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই পড়ে। তদন্তে গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

এ বারই প্রথম উত্তরপ্রদেশে বিধান পরিষদের স্নাতক ও শিক্ষক নির্বাচনী কেন্দ্রগুলির ভোটার তালিকা তৈরির জন্য অনলাইন ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। এর আগে জেলা স্তরে মূলত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে এই কাজ করা হত। নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভোটার নিবন্ধন, আবেদন যাচাই, অনুমোদন বা বাতিল, একই ভোটারের একাধিক এন্ট্রি শনাক্ত করা এবং তালিকা প্রকাশের মতো একাধিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

নির্বাচনী দফতরের তথ্য অনুযায়ী, আইটি দল প্রায় চার মাসের মধ্যে এই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার প্রক্রিয়াকে দ্রুত করলেও তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নামের মতো মৌলিক পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য চূড়ান্ত তালিকায় পৌঁছনোর আগে যথাযথ ভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।

এ দিকে, ভোটার তালিকার ভুলের পাশাপাশি উত্তরপ্রদেশের বিধান পরিষদ নির্বাচন ঘিরে জাল ভোট, ভোটারদের ভয় দেখানো এবং বুথ দখলের অভিযোগও তুলেছে বিরোধীরা। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। তবে ভোটার তালিকার প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক ভুলের সঙ্গে ভোটে কারচুপির অভিযোগকে এক করে দেখা যায় না। অভিযোগগুলির সত্যতা নির্ধারণের জন্য পৃথক তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন।

কমিশনের সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ ছিল, তালিকার ভুলের কারণে কোনও বৈধ ভোটার যেন ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত না হন। ভোটারের পরিচয় অনুমোদিত নথি বা তালিকায় থাকা অন্যান্য তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা গেলে শুধু নামের সামান্য বানান বা ছাপার ভুলের কারণে তাঁকে ভোট দিতে বাধা দেওয়া যাবে না বলে নির্বাচনী দফতরের তরফে আগেই জানানো হয়েছিল।

উত্তরপ্রদেশ বিধান পরিষদের ১১টি আসনে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে ২৩ অক্টোবর। ফল ঘোষণা হওয়ার কথা ২৭ অক্টোবর। তার আগে ভোটার তালিকার ভুল নিয়ে ওঠা প্রশ্নের পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের ব্যাখ্যায় কী উঠে আসে এবং প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়, সেদিকেও নজর থাকবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর