লক্ষ্মীপুজোর বাজারে আগুন দাম, ধান-প্রদীপ থেকে সবজি—চাপে গৃহস্থ

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগে কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ির বাজারে সবজি ও পুজোর উপকরণের দাম চড়া। বৃষ্টিতে উৎপাদন ও সরবরাহে প্রভাব পড়ার কথা জানাচ্ছেন বিক্রেতারা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আগে বাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষ। পুজোর উপকরণ থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজি—বেশিরভাগ জিনিসের দামই চড়া। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ির বিভিন্ন বাজারে একই ছবি দেখা যাচ্ছে। ফলে লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন করতে গিয়ে অনেক পরিবারকেই বাজেট কমাতে হচ্ছে। পুজোর ভোগে খিচুড়ি রান্নার পরিকল্পনা থাকলেও সবজির দাম দেখে পিছিয়ে আসছেন অনেকে।

শুক্রবার থেকেই বিভিন্ন বাজারে কেনাকাটার ভিড় বাড়লেও দরদাম করে বিশেষ সুবিধা হচ্ছে না বলে জানাচ্ছেন ক্রেতারা। ধানের শিষ, মাটির প্রদীপ, ঘট, মালা কিংবা আলপনার সামগ্রী—প্রতিটি জিনিস কিনতেই আগের তুলনায় বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। বিক্রেতাদের একাংশের আশঙ্কা, শনিবার চাহিদা আরও বাড়লে দামও চড়তে পারে।

লক্ষ্মীপুজোর উপকরণের তালিকায় থাকা ধানের শিষের দামও ক্রেতাদের চিন্তা বাড়িয়েছে। বাজারে একটি ধানের শিষ বিক্রি হচ্ছে ৫ টাকায়। মাত্র ৫ গ্রাম ওজনের পঞ্চশস্যের প্যাকেটের দাম ২০ টাকা। সরু কাগজের মালা ও চাঁদমালা—দুটিরই দাম ২৫ টাকা করে।

আলপনার জন্য ছোট্ট এক টুকরো খড়িমাটির দাম ১০ টাকা। লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের স্টিকার কিনতে খরচ হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। দুটি সলতে-সহ মাটির প্রদীপের দাম ১০ টাকা, একটি ঘটের দাম ২০ টাকা এবং ছোট ডাবের দাম ২৫ টাকা।

পুজোর অন্যতম উপকরণ আখ কিনতেও গুনতে হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা। ফলে অল্প কয়েকটি সামগ্রী কিনলেও মোট খরচ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা ছোট করছেন।

সবজির বাজারে দাম বৃদ্ধির পিছনে সরবরাহের ঘাটতিকেই অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিক্রেতারা। শিলিগুড়ির বিধান মার্কেটের সবজি বিক্রেতা নরেশ সরকারের বক্তব্য, বৃষ্টির কারণে উত্তরবঙ্গে সবজির চাষ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। ফলে বাইরের রাজ্য বা অঞ্চল থেকে আসা সবজির উপর নির্ভরতা বেড়েছে। জোগান কম থাকায় দামও বাড়ছে বলে তাঁর দাবি।

শিলিগুড়ির ফুলেশ্বরী বাজারের বিক্রেতা রতন সাহাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পাইকারি বাজার বা মান্ডিতে পর্যাপ্ত সবজি আসছে না। যে পরিমাণ সবজি পাওয়া যাচ্ছে, তা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। সেই বাড়তি খরচের প্রভাব পড়ছে খুচরো বাজারে।

তবে বাজারে সবজির দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উৎপাদন, পরিবহণ, পাইকারি সরবরাহ ও স্থানীয় চাহিদার পৃথক প্রভাব কতটা, তার কোনও সরকারি পরিসংখ্যান এই প্রতিবেদনে নেই।

শুক্রবার উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বাজারে সবজি কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের বেশি টাকা খরচ করতে হয়েছে। বাজারে কাঁচালঙ্কার দাম কেজিতে ১২০ টাকা। পটল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে। বেগুনের দাম কেজিতে ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফুলকপি কিনতে খরচ হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি।

মহালয়ার আগেও যে বরবটি ৬০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছিল, লক্ষ্মীপুজোর বাজারে তার দাম বেড়ে হয়েছে ৮০ টাকা। শসার দামও কেজিতে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় পৌঁছেছে। এ ছাড়া বাঁধাকপি, মুলো, গাজর, শিম ও ঝিঙের মতো সবজির দামও চড়া বলে জানাচ্ছেন ক্রেতারা।

ফলে পুজোর ভোগের জন্য প্রয়োজনীয় সবজি একসঙ্গে কেনা অনেক পরিবারের পক্ষেই কঠিন হয়ে উঠেছে। বাজার ঘুরে তুলনামূলক কম দামের সবজি খুঁজতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

লক্ষ্মীপুজোয় খিচুড়ি ভোগের আয়োজন বহু পরিবারের পরিচিত রীতি। কিন্তু সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই আয়োজন নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। শিলিগুড়ির ভারত নগরের বাসিন্দা নিবারণ চক্রবর্তীর কথায়, বাজারে আলু ছাড়া সস্তায় কিছু পাওয়া কঠিন। অন্য বছরের মতো খিচুড়ির আয়োজন করবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তিনি।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন সুভাষপল্লির বাসিন্দা মধুমিতা ভট্টাচার্য। বিধান মার্কেটে কেনাকাটা করতে গিয়ে তিনি জানান, শুধু সবজি নয়, মালা, প্রদীপ ও ঘটের দামও বেশি। তাই প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনলেও পরিমাণ কমিয়ে দিতে হচ্ছে।

পুজোর বাজারে এই বাড়তি খরচের চাপ মূলত পড়ছে সীমিত বাজেটে সংসার চালানো পরিবারগুলির উপর। পুজোর আনন্দ বজায় রাখতে গিয়ে একদিকে উপকরণ কেনা, অন্যদিকে ভোগের আয়োজন—দুই ক্ষেত্রেই হিসাব কষতে হচ্ছে গৃহস্থদের।

বিক্রেতাদের একাংশের আশঙ্কা, লক্ষ্মীপুজোর ঠিক আগে শনিবার বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বাড়লে কয়েকটি পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। তবে সব পণ্যের দাম বাড়বেই, এমন কোনও নিশ্চিত পূর্বাভাস নেই। সরবরাহ ও চাহিদার পরিস্থিতির উপরই বাজারদরের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে।

এই মুহূর্তে উত্তরবঙ্গের বাজারে সবজি ও পুজোর সামগ্রীর চড়া দামই ক্রেতাদের প্রধান উদ্বেগ। লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন করতে গিয়ে অনেকেই প্রয়োজনের তালিকা ছোট করছেন, কেউ আবার ভোগের মেনুতেও পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। উৎসবের মরশুমে বাজারের এই বাড়তি খরচ সাধারণ পরিবারের বাজেটে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা স্পষ্ট হচ্ছে ক্রেতাদের অভিজ্ঞতাতেই।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর