পুজোর ই-পাস সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলায় রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারির পর মুখ খুললেন সঙ্গীতশিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ঘটনায় নিজের সন্তোষের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি মনে করি যে যা করবে সে তার ফল এ জীবনেই পেয়ে যাবে। এই গ্রেপ্তারে আমি খুশি।” এর আগে রাজ্যের তৎকালীন সরকারের আমলে সঙ্গীত জগতে অনিয়ম, মঞ্চ বণ্টন এবং কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন ঋদ্ধি-সহ একাধিক শিল্পী। সেই পুরনো অভিযোগ ফের আলোচনায় উঠে এসেছে ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারির পর।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ED) জেরার পর কলকাতার সিজিও কমপ্লেক্স থেকে বেরোনোর সময় ইন্দ্রনীল সেনকে গ্রেপ্তার করে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা। পুজোর ই-পাস সংক্রান্ত মামলাতেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তদন্তের ফল এবং আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতির উপরই পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে।
রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে আগেও সরব হয়েছিলেন ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রীর জনতার দরবারে গিয়ে তিনি এবং দোলা মুখোপাধ্যায়-সহ কয়েকজন সঙ্গীতশিল্পী নিজেদের অভিযোগ জানিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, তৎকালীন সরকারের আমলে সঙ্গীত জগতেও সিন্ডিকেটের প্রভাব ছিল।
শিল্পীদের অভিযোগ অনুযায়ী, অনুষ্ঠান করার জন্য মঞ্চ পাওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। চাকরি বিক্রির মতো মঞ্চ বিক্রির অভিযোগও তুলেছিলেন তাঁরা। ইন্দ্রনীল সেন যখন রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্বে ছিলেন, সেই সময়ের কাজকর্ম নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন অভিযোগকারীরা।
তবে এই অভিযোগগুলি শিল্পীদের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচ্য। এগুলিকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের আইনি অবস্থাও পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারির খবর সামনে আসার পর বুধবার ফোনে প্রতিক্রিয়া দেন ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং শিল্পীদের কাজের সুযোগ পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ।
ঋদ্ধি বলেন, “আমি মনে করি যে যা করবে সে তার ফল এ জীবনেই পেয়ে যাবে। এই গ্রেপ্তারে আমি খুশি।”
এর পরেও পূর্বতন সরকারের আমলে নিজের অভিজ্ঞতা এবং সঙ্গীত জগতের পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ঋদ্ধির দাবি, দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে তিনি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত এবং আন্তর্জাতিক স্তরেও কাজ করেন। তা সত্ত্বেও যদি কোনও শিল্পীকে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে নতুনদের পক্ষে প্রতিষ্ঠিত হওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তাঁর বক্তব্যের মূল উদ্বেগ ছিল, গ্রামগঞ্জ থেকে যাঁরা সঙ্গীত জগতে কাজ করতে আসেন, তাঁদের সামনে সুযোগের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি কতটা কঠিন হতে পারে। শিল্পীদের কাজের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ক্ষমতা বা প্রভাবের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে উঠে এসেছে শিল্পীদের কাজের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমান পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের আমলে কিছু মানুষের ক্ষমতা ও স্বার্থের কারণে শিল্পীদের পেশাগত জীবনে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল।
তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরাও যদি কাজের সুযোগ হারানোর আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে নতুন শিল্পীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে ছোট শহর ও গ্রাম থেকে উঠে আসা প্রতিভাদের ক্ষেত্রে অনুষ্ঠান, মঞ্চ এবং পেশাগত যোগাযোগের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
ঋদ্ধি আরও অভিযোগ করেছেন, প্রশাসনের শীর্ষস্তরে থাকা ব্যক্তিদের চারপাশে স্বার্থসংশ্লিষ্ট মানুষের প্রভাব থাকলে তার প্রভাব বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়তে পারে। এ বিষয়ে তিনি আগের মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে সঙ্গীত জগতে সিন্ডিকেটের অভিযোগ এবং মঞ্চ বণ্টন নিয়ে ওঠা প্রশ্নের সত্যতা নির্ধারণ করতে স্বাধীন তদন্ত বা নির্ভরযোগ্য নথির প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলির বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্তের তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই।
ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেপ্তারির ঘটনায় এখন নজর থাকবে পুজোর ই-পাস সংক্রান্ত মামলার তদন্তের দিকে। ঠিক কী ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেই অভিযোগের সঙ্গে প্রাক্তন মন্ত্রীর যোগসূত্র নিয়ে তদন্তকারীদের বক্তব্য কী এবং তদন্তে কী তথ্য সামনে আসে—এসব বিষয়ই পরবর্তী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
একই সঙ্গে, গ্রেপ্তারির পর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, এই ঘটনার আগে থেকেই তিনি সঙ্গীত জগতের কাজের সুযোগ ও মঞ্চ বণ্টন নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন।
তবে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, পুলিশের গ্রেপ্তারির পদক্ষেপ এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া—এই তিনটি পৃথক বিষয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই পার্থক্য বজায় রাখাই জরুরি।



