মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ায় ভারতের এলপিজি আমদানিতে চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জরুরি বৈঠক করেন পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী ও বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে। বৈঠকের পর দেশের রিফাইনারিগুলিকে এলপিজি উৎপাদন অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকার আশ্বস্ত করেছে— দেশে আপাতত রান্নার গ্যাসের ঘাটতি নেই, তবে সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে একাধিক জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক উত্তেজনা বাড়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ পড়তে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহণের সামুদ্রিক পথ, বর্তমানে কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। এই পথ দিয়েই ভারতের আমদানিকৃত এলপিজির বড় অংশ দেশে পৌঁছায়।


কেন বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে
ভারত বছরে প্রায় ৩১.৩ মিলিয়ন টন এলপিজি ব্যবহার করে। এর মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশই আমদানি নির্ভর। আর সেই আমদানির ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে আসে, যার বেশিরভাগই হরমুজ প্রণালী হয়ে ভারতে পৌঁছায়। এই গুরুত্বপূর্ণ পথ অচল হয়ে পড়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয়েছে।

সাধারণ গ্রাহকদের অগ্রাধিকার
সরকারি সূত্রের মতে, দেশের মোট এলপিজি ব্যবহারের প্রায় ৮৭ শতাংশই গৃহস্থালির রান্নার গ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাকি ১৩ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে, যেমন হোটেল, রেস্তরাঁ এবং বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, গৃহস্থালি গ্রাহকদের জন্য গ্যাস সরবরাহকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফলে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


ইতিমধ্যেই মুম্বই, বেঙ্গালুরুসহ কয়েকটি বড় শহরে হোটেল ও রেস্তরাঁ শিল্পে এলপিজি সরবরাহে চাপের লক্ষণ দেখা গেছে।
উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ
সংকট মোকাবিলায় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক দেশের রিফাইনারিগুলিকে এলপিজি উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। এর জন্য কিছু ক্ষেত্রে পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন কমিয়ে গ্যাস উৎপাদনের দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে।
বুকিং নিয়মেও পরিবর্তন
মজুতদারি এবং কালোবাজারি রুখতে এলপিজি সিলিন্ডার বুকিংয়ের সময়সীমাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।আগে যেখানে ২১ দিনে একবার সিলিন্ডার বুকিং করা যেত, এখন তা বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে।
জরুরি পরিষেবায় অগ্রাধিকার
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আমদানিকৃত এলপিজির একটি অংশ হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো জরুরি পরিষেবার জন্য সংরক্ষিত রাখা হবে।
বিশেষ কমিটি গঠন
পরিস্থিতি সামাল দিতে তেল বিপণন সংস্থাগুলির তিনজন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরকে নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই কমিটি হোটেল, রেস্তরাঁ এবং শিল্পক্ষেত্রের এলপিজি চাহিদা পর্যালোচনা করে “প্রয়োজন, অগ্রাধিকার এবং উপলব্ধতা” অনুযায়ী গ্যাস বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেবে।
হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (HPCL) জানিয়েছে, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার উপর তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।







