২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্য রাজনীতিতে যেমন ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) নতুন সমীকরণ তৈরি করেছিল, ঠিক তেমনই ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের মুখে ফের এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গে। সোমবার, ২২ ডিসেম্বর রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে আরও একটি নতুন দল। প্রতিষ্ঠাতা দুই বারের বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। দল ঘোষণার আগেই তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিজেপি বিরোধী সবাইকে একত্রে লড়াইয়ের ডাক, তবে ‘ইগো’ থাকলে একাই লড়াইয়ে নামার হুঁশিয়ারি।
দল ঘোষণার আগের দিন রবিবার কার্যত দম ফেলার ফুরসত নেই হুমায়ুনের। বেলডাঙা জুড়ে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। সোমবার দুপুর ১টায় বেলডাঙার খাগরুপাড়া মোড়ে প্রায় ৪৯ বিঘা জমির উপর আয়োজিত বিশাল সভা থেকেই প্রকাশ্যে আসবে দলের নাম ও রাজ্য কমিটি। হুমায়ুনের দাবি, এই কর্মসূচিই রাজ্যে শাসকদলের পরাজয়ের আরও একটি বড় ধাপ হয়ে উঠবে।
মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা ঘিরে তৃণমূলের সঙ্গে সংঘাত, সাসপেনশন, ইস্তফা বিতর্ক— গত কয়েক মাসে একের পর এক ঘটনায় শিরোনামে থেকেছেন হুমায়ুন কবীর। সমালোচকেরা তাঁকে আবেগপ্রবণ বললেও, নিজের দল নিয়ে তিনি অনড়। তাঁর কথায়, রাজনীতি মানে হিসাব করে পা ফেলা। সেই হিসাবেই নতুন দলের আত্মপ্রকাশ।

দল ঘোষণার পরপরই প্রথম যে নাম ঘোষণা করা হবে, তা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সভাপতির। মুর্শিদাবাদের জেলা সভাপতি নিয়ে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদল হওয়ায় সেই নাম আপাতত প্রকাশ্যে আসছে না। জানা যাচ্ছে, রাজ্যের ৩৪১টি ব্লক এবং ১২৫টি পুর এলাকায় কমিটি ঘোষণা করা হবে ধাপে ধাপে।
হুমায়ুন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্য সংখ্যালঘু ভোটকে একত্রিত করা। অন্তত ৯০টি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠনে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। সেই লক্ষ্যেই কংগ্রেস, বাম এবং আইএসএফ-কে একত্রে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে প্রশ্ন উঠছে— দল ঘোষণার দিন হিসেবে সোমবার কেন? জুম্মাবার নয় কেন? হুমায়ুনের যুক্তি আবেগঘন। তাঁর মা, যিনি শতবর্ষ অতিক্রম করেছেন, জানিয়েছেন সোমবার ভোরেই তাঁর জন্ম। মায়ের ইচ্ছেতেই সোমবারেই দলের আত্মপ্রকাশ। হুমায়ুনের ভাষায়, মানুষের জন্য দল গড়া হলে সোমবারের চেয়ে ভালো দিন আর কী হতে পারে।
দলের নাম এখনও গোপন। বেলডাঙা জুড়ে পোস্টার থাকলেও কোথাও নাম বা প্রতীক লেখা নেই। হুমায়ুন বলছেন, নাম ও প্রতীক জানতেই অন্তত চার লক্ষ মানুষ জমায়েত করবেন। প্রতীক হিসেবে তাঁর প্রথম পছন্দ ‘টেবিল’— ২০১৬ সালে নির্দল হিসেবে এই প্রতীকেই লড়েছিলেন তিনি। বিকল্প হিসেবে রয়েছে জোড়া গোলাপ।
রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেও রাখলেন হুমায়ুন। তাঁর দাবি, মুর্শিদাবাদের মানুষ কংগ্রেসকে প্রায় বর্জন করেছেন এবং তৃণমূলকে ছুড়ে ফেলার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাই দলের নামে কোনও দলীয় শব্দ থাকবে না। সাধারণ মানুষ সহজেই যাতে একাত্ম হতে পারেন, সেই ভাবনাতেই দলের নাম রাখা হয়েছে। তাঁর কথায়, “এটা হবে বাংলার আমজনতার পার্টি। আমজনতার উন্নয়নই একমাত্র লক্ষ্য।”
অন্য দিকে, এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে শাসকদল ও বিরোধী শিবিরে। তৃণমূলের জেলা নেতৃত্বের বক্তব্য, ধর্মীয় আবেগ দিয়ে জমায়েত আর রাজনৈতিক সমর্থন এক বিষয় নয়। কংগ্রেসের রাজ্য নেতৃত্বও সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
সব মিলিয়ে সোমবারের সভা ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে। ড্রোন, এলইডি স্ক্রিন, বিশাল মঞ্চ, হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক ও কড়া ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ— বেলডাঙা যেন রীতিমতো যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে। প্রশ্ন একটাই— এই নতুন দল কি সত্যিই বদলে দিতে পারবে বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ, নাকি তা সময়ের স্রোতে মিলিয়ে যাবে? উত্তর মিলবে সোমবারই।



