রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর একের পর এক স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থায় তৃণমূলের ভিত নড়ে যাচ্ছে। পুরসভার পর এবার বড় ধাক্কার মুখে হাওড়া জেলা পরিষদ। জেলা পরিষদের সভাধিপতি ও সহ-সভাধিপতির বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনে কার্যত বিদ্রোহের পতাকা তুললেন তৃণমূলেরই ২৮ জন সদস্য। ফলে হাওড়া জেলা পরিষদের বর্তমান বোর্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক চর্চা।
বুধবার জেলা পরিষদের সদস্য তুষার ঘোষের নেতৃত্বে ২৮ জন সদস্য স্বাক্ষরিত অনাস্থা প্রস্তাব জমা দেওয়া হয় পঞ্চায়েত দপ্তরের অধীন প্রেসিডেন্সি বিভাগের ডিভিশনাল কমিশনারের কাছে। বর্তমানে হাওড়া জেলা পরিষদে তৃণমূলের মোট ৪২ জন সদস্য রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
অনাস্থা প্রস্তাবের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তুষার ঘোষ অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে সভাধিপতি ও সহ-সভাধিপতির বিরুদ্ধে একাধিক অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠছিল। তাঁর দাবি, জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নির্দেশেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তুষার ঘোষ আরও অভিযোগ করেন, উলুবেড়িয়ার এক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার প্রভাবেই জেলা পরিষদের কার্যকলাপ পরিচালিত হয়েছে। উন্নয়নমূলক কাজ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত— সব ক্ষেত্রেই সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
তবে এই ক্ষোভ নতুন নয় বলেও জানিয়েছেন বিদ্রোহী সদস্যরা। তাঁদের বক্তব্য, তৃণমূল সরকারের আমলেও একাধিকবার বিষয়টি দলীয় নেতৃত্বের নজরে আনা হয়েছিল। কিন্তু কোনও কার্যকর পদক্ষেপ হয়নি। রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরই তাই তাঁরা প্রকাশ্যে অনাস্থা আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, আগামী দিনে আরও সদস্য তাঁদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন। তুষার ঘোষের কথায়, বর্তমানে ২৮ জন সদস্য অনাস্থার পক্ষে থাকলেও সেই সংখ্যা ৩৭-এ পৌঁছতে পারে। সেক্ষেত্রে বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষে জেলা পরিষদ পরিচালনা করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে হাওড়া জেলা পরিষদের সহ-সভাধিপতি অজয় ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত তাঁদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও অনাস্থা সংক্রান্ত নথি পৌঁছয়নি। প্রয়োজনীয় নথি হাতে এলে তবেই তাঁরা এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন।
এদিকে শুধু হাওড়াই নয়, বাঁকুড়া পুরসভাতেও তৃণমূলের অন্দরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। পুরপ্রধান অলকা সেন মজুমদারের বিরুদ্ধে ১৬ জন কাউন্সিলর জেলাশাসকের কাছে অভিযোগ জমা দিয়েছেন। যদিও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ পুর আইন অনুযায়ী পুরপ্রধানকে অপসারণের জন্য নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। সেই প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি।
ফলে রাজনৈতিকভাবে এই ঘটনাগুলি তাৎপর্যপূর্ণ হলেও প্রশাসনিক স্তরে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনই স্পষ্ট নয়। তবে হাওড়া জেলা পরিষদ থেকে বাঁকুড়া পুরসভা— তৃণমূলের অন্দরে বাড়তে থাকা অসন্তোষ যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।



