হিন্দু ধর্মের এক অত্যন্ত পবিত্র দিন হলো গুরু পূর্ণিমা। এটি শুধু আধ্যাত্মিকতার উৎসব নয়, গুরু-শিষ্য পরম্পরারও উৎসব। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় এই পুণ্যদিবস। গুরু পূর্ণিমা ২০২৫ সালে পালিত হবে ১০ জুলাই, বৃহস্পতিবার।
এই দিনে গুরুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। গুরু মানেই জ্ঞানের আলো, অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যিনি আমাদের নিয়ে যান। এই গুরু পূর্ণিমায় সেই গুরুদের স্মরণ করা হয় যাঁরা আমাদের জীবনে দিশা দেখিয়েছেন।
গুরু পূর্ণিমা কি?
গুরু পূর্ণিমা হল সেই দিন, যেদিন শিষ্যরা তাঁদের গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। “গু” মানে অন্ধকার, “রু” মানে আলো—এই দুই শব্দ থেকে “গুরু” শব্দটির সৃষ্টি। গুরু সেই ব্যক্তি, যিনি অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলো দেন।
এই দিনটি মহর্ষি বেদব্যাসের জন্মতিথি বলেও পরিচিত। তিনি চারটি বেদ সংকলন করেন। তাই একে ব্যাস পূর্ণিমা বলেও ডাকা হয়।

গুরু পূর্ণিমা ২০২৫ কবে? সময় ও তিথি
এবছর গুরু পূর্ণিমা ২০২৫ পড়ছে ১০ জুলাই, বৃহস্পতিবার।
পূর্ণিমা তিথি শুরু: ৯ জুলাই ২০২৫, রাত ৮:১৬ মিনিট
পূর্ণিমা তিথি শেষ: ১০ জুলাই ২০২৫, রাত ১০:৪২ মিনিট
এই সময়ের মধ্যেই গুরু পূজার বিধান রয়েছে। সকালের সময়ই শুভ বলে মনে করা হয় গুরু পূর্ণিমা পালন করার জন্য।

গুরু পূর্ণিমার মাহাত্ম্য
গুরু পূর্ণিমার মাহাত্ম্য অপরিসীম। গুরু শাস্ত্র মতে ঈশ্বরের থেকেও শ্রেষ্ঠ, কারণ ঈশ্বরের দর্শন সম্ভব হয় গুরুর কৃপায়। এই দিনে শিষ্যরা গুরুর চরণে পুষ্পাঞ্জলি, প্রদীপ ও ফল-ফুল নিবেদন করেন।
তাঁদের আশীর্বাদ নেওয়া হয় জীবনের দিশা ঠিক করতে। এই দিনে অনেকে ব্রহ্মচার্য পালন করেন, উপবাস করে গুরু স্তব পাঠ করেন, আবার কেউ কেউ আশ্রমে গিয়ে গুরুদেবের দর্শন করেন।

গুরু পূর্ণিমা কেন পালন করা হয়?
অনেকেই প্রশ্ন করেন, গুরু পূর্ণিমা কেন পালন করা হয়? উত্তরটি ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
এই দিনে মহর্ষি ব্যাসদেব জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বৈদিক জ্ঞান সংকলন করেন, যা পরে মানব সভ্যতার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়াও, গৌতম বুদ্ধ এই দিনেই সারনাথে তাঁর প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন করেন। ফলে হিন্দু এবং বৌদ্ধ উভয় ধর্মেই এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

গুরু পূর্ণিমা ২০২৫ ছবি ও সংস্কৃতি
গুরু পূর্ণিমার দিনে অনেকেই গুরু পূর্ণিমার ছবি শেয়ার করেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। গুরুদেবের প্রতিকৃতি, আশ্রমের দৃশ্য, পদধূলির ছবি—এইসবের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেন।
আধুনিক যুগে ছাত্ররা শিক্ষক, কোচ বা মেন্টরদের এই দিনে শুভেচ্ছা জানান মোবাইল মেসেজ, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা সরাসরি উপহার দিয়ে।
গুরু পূর্ণিমা পালনের রীতি ও করণীয়
গুরু পূর্ণিমার দিনে কী করা উচিত? নিচে উল্লেখ করা হলো:
-
সকালে উঠে স্নান সেরে পবিত্র বস্ত্র পরিধান করুন
-
গুরুর ছবি বা চরণে পুষ্প, ধূপ, প্রদীপ ও ফল নিবেদন করুন
-
গুরুবন্দনা বা গুরু স্তোত্র পাঠ করুন
-
যদি সম্ভব হয়, গুরুর দর্শন করে আশীর্বাদ নিন
-
গুরুপ্রদত্ত উপদেশ অনুযায়ী দিনটি কাটান
এই সব নিয়ম মানলে গুরু পূর্ণিমা হয়ে উঠবে এক জীবনের পাথেয়।
গুরু পূর্ণিমা ২০২৫ সময়সূচী এক নজরে
| বিষয় | সময় |
|---|---|
| পূর্ণিমা তিথি শুরু | ৯ জুলাই ২০২৫, রাত ৮:১৬ মিনিট |
| পূর্ণিমা তিথি শেষ | ১০ জুলাই ২০২৫, রাত ১০:৪২ মিনিট |
| শুভ পূজা সময় | ১০ জুলাই সকাল ৬টা – দুপুর ১২টা |

গুরু পূর্ণিমা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
আজকের যুগে গুরুর সংজ্ঞা অনেক বিস্তৃত। শুধু ধর্মীয় গুরু নয়, শিক্ষক, কোচ, মেন্টর, এমনকি জীবনের পথপ্রদর্শক সকলেই গুরু। এই দিনে তাঁদের কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করা আমাদের কর্তব্য।
তাই গুরু পূর্ণিমা ২০২৫ শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি এক মূল্যবোধের চর্চা—যেখানে কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা ও শিক্ষার মহত্ব উদযাপন করা হয়।

গুরু পূর্ণিমা ২০২৫ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবনের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে থাকে একজন গুরুর অবদান। ১০ জুলাই ২০২৫, এই বিশেষ দিনে চলুন আমরা সেই গুরুজনদের শ্রদ্ধা জানাই, যাঁরা আমাদের জীবনে আলো এনে দিয়েছেন।
এই গুরু পূর্ণিমায় আপনার গুরুজিকে একটি ফোন করুন, প্রণাম করুন কিংবা একটি ফুল দিন—আর অনুভব করুন, জীবন কতটা আলোকময় হয়ে ওঠে গুরুর আশীর্বাদে।



