কলকাতা: আইন-শৃঙ্খলা, তোলাবাজি, জমি দখল ও সরকারি সম্পত্তি নষ্টের মতো অভিযোগ মোকাবিলায় বড় পদক্ষেপের পথে রাজ্য সরকার। সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা (West Bengal Legislative Assembly)-য় পেশ হল বহুচর্চিত পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬ (West Bengal Public Safety and Control of Anti-Social Activities Bill, 2026)। রাজনৈতিক তরজা, হট্টগোল ও তীব্র বিতর্কের মধ্যেই বিল ঘিরে সরগরম হয়ে ওঠে বিধানসভা।
গুন্ডাদমন বিল ঘিরে উত্তপ্ত বিধানসভা
সোমবার বিধানসভায় বিলটি পেশ করেন বিশাল লামা (Bishal Lama), যিনি রাজ্যের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সরকারপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট, বেআইনি দখল, সম্পত্তি ভাঙচুর ও সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নতুন আইনি কাঠামো প্রয়োজন ছিল। সেই লক্ষ্যেই আনা হয়েছে এই নতুন বিল।
বিলটি পেশ হওয়ার পর থেকেই শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
‘পুলিশকে টেবিলের তলা থেকে বের করার সময় এসেছে’
বিলের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শংকর ঘোষ (Shankar Ghosh) বলেন, অতীতে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস, তোলাবাজি, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি। তাঁর দাবি, নতুন আইনের মাধ্যমে পুলিশ আরও সক্রিয়ভাবে সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলা করতে পারবে।
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, এই আইন এমন বার্তা দেবে যাতে সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করার সাহস কেউ না পায়। পাশাপাশি তাঁর মন্তব্য, “পুলিশকে টেবিলের তলা থেকে বের করে সমাজবিরোধীদের টেবিলের তলায় ঢোকানোর সময় এসেছে।”
বিরোধীদের আপত্তি, হট্টগোল বিধানসভায়
সরকারপক্ষের বক্তব্যের পর বিলের বিরোধিতা করতে উঠে বক্তব্য শুরু করেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় (Sobhandeb Chattopadhyay)। তবে তাঁর বক্তৃতা শুরু হতেই বিধানসভায় হট্টগোল শুরু হয়। অভিযোগ, বিশৃঙ্খলার কারণে তিনি কার্যত বক্তব্য শেষ করতে পারেননি।
পরে তিনি বিলের বিষয়বস্তুর পরিবর্তে বিরোধী দলনেতার পদ নিয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
অগ্নিমিত্রার দাবি, কঠোর আইন প্রয়োজন
বিলের সমর্থনে বক্তব্য রাখেন অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul)। তাঁর দাবি, অতীতে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ভয়ের পরিবেশে বাস করতেন। তিনি বলেন, সমাজবিরোধী কার্যকলাপ ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি।
তিনি আরও জানান, উস্কানিমূলক বক্তব্য থেকেও যদি আইন-শৃঙ্খলার অবনতি বা সহিংসতার পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেক্ষেত্রেও এই আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
পুলিশের ক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন আইএসএফের
অন্যদিকে, বিলের বিরোধিতা করেন নওশাদ সিদ্দিকি (Nawsad Siddique)। তাঁর আশঙ্কা, সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করার মতো বিধান থাকলে তার অপব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তিনি দাবি করেন, প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক, তবে নির্দোষ মানুষের অধিকার যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সেই বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর পক্ষ থেকে বিলটি আরও বিস্তারিত পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত কমিটিতে পাঠানোর দাবি জানানো হয়।
বিলে কী কী অপরাধকে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে ধরা হয়েছে?
বিলের খসড়া অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ নষ্ট করে বা জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে— এমন একাধিক কর্মকাণ্ডকে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের আওতায় আনা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে—
- তোলাবাজি ও চাঁদাবাজি
- বেআইনি জমি বা সম্পত্তি দখল
- সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর
- ব্যবসা বা পেশায় বাধা সৃষ্টি
- বেআইনি বালি, পাথর ও খনি উত্তোলন
- বনজ ও বন্যপ্রাণ সম্পদের ক্ষতি
- সংগঠিত অপরাধমূলক কার্যকলাপ
ক্ষতিপূরণেও কড়া অবস্থান
বিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ক্ষতিপূরণের বিধান। খসড়া অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কমিশন চাইলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের দ্বিগুণ পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ বা জরিমানা ধার্য করতে পারবে।
সরকারি সূত্রের দাবি, অপরাধ করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা রুখতেই এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
গুন্ডাদমন বিল ২০২৬: গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
- সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলায় নতুন আইনি কাঠামো
- সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে তদন্তে পুলিশের ক্ষমতা বৃদ্ধি
- সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা
- বেআইনি জমি দখল, সিন্ডিকেট, তোলাবাজি আইনের আওতায়
- ক্ষয়ক্ষতির দ্বিগুণ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের বিধান
রাজ্য সরকার বিলটিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে বিলটি ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক আগামী দিনেও জারি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।



