নজরবন্দি ব্যুরো: ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই রাজ্যে শুরু হল দৈনিক ডেঙ্গি বুলেটিন প্রকাশ। স্বাস্থ্য দফতরের ওয়েবসাইটে নিয়মিত এই বুলেটিন প্রকাশ করা হচ্ছে, যেখানে ডেঙ্গি পরীক্ষার সংখ্যা, পজিটিভ রোগী এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আক্রান্তদের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে। শুক্রবারের প্রকাশিত বুলেটিন অনুযায়ী, রাজ্যে বর্তমানে ডেঙ্গি আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ২০৬ জন।
ডেঙ্গির পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন চিকিৎসকদের একাংশ। কারণ, শুধু আক্রান্তের সংখ্যা নয়, কতগুলি পরীক্ষা হয়েছে এবং তার মধ্যে কতজনের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে—এই তথ্যও সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য দফতরের শুক্রবারের বুলেটিন অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত এলাইজা (ELISA) পদ্ধতিতে ৭১২২ জনের রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৭৪ জনের রিপোর্ট ডেঙ্গি পজিটিভ এসেছে। তবে চলতি মরসুমে রাজ্যে মোট কতজন ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন, সেই cumulative figure ওই বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়নি।
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের দাবি, চলতি বছরের ৩৬তম সপ্তাহ শেষ হওয়ার হিসাব ধরলে রাজ্যে মোট ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি। অর্থাৎ, দৈনিক বুলেটিনে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী এবং পরীক্ষার তথ্য সামনে এলেও মরসুমের শুরু থেকে মোট আক্রান্তের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা আলাদা ভাবে জানা যাচ্ছে না।
ডেঙ্গি নিয়ে তথ্য প্রকাশের এই সিদ্ধান্তের পটভূমিতে রয়েছে রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থানও। ১ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গি ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য দফতরে পর্যালোচনা বৈঠক করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকের পর তিনি জানিয়েছিলেন, ডেঙ্গি নিয়ে আতঙ্কের কারণ নেই, তবে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে হবে। সেই সময় তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে তখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪ হাজারের কিছু বেশি এবং সক্রিয় রোগী ছিলেন ১৪৮ জন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক বলে তিনি দাবি করেছিলেন।
পরিস্থিতি পর্যালোচনার ওই বৈঠকে স্বাস্থ্য, পুরসভা-সহ একাধিক দফতরকে নিয়ে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল। সেপ্টেম্বর মাসকে ডেঙ্গি সচেতনতার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও সামনে আসে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং পরীক্ষার উপর জোর দেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছিল।
এ বার স্বাস্থ্য দফতরের ওয়েবসাইটে দৈনিক বুলেটিন প্রকাশ শুরু হওয়ায় ডেঙ্গি পরিস্থিতির পরিবর্তন নিয়মিত নজরে রাখার সুযোগ তৈরি হল। বিশেষ করে কোনও এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে কি না, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা কী ভাবে বদলাচ্ছে এবং পরীক্ষার তুলনায় পজিটিভিটির প্রবণতা কেমন—এই তথ্যগুলি সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
চিকিৎসকদের একাংশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, কোনও সংক্রামক রোগের মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্তের সংখ্যা জানা গেলে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও নিজেদের এলাকায় পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক হতে পারেন।
চিকিৎসক নেতা মানস গুমটার বক্তব্য, কোনও রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই করতে হলে তথ্য গোপন না করে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র সামনে রাখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে সরকারের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি তথ্য প্রকাশের ধারাবাহিকতাও বজায় রাখা জরুরি।
ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকীও দৈনিক তথ্য প্রকাশের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ডেঙ্গিকে অজানা জ্বর হিসেবে দেখানোর পরিবর্তে রোগের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষকে জানানো সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোথাও ঘাটতি থাকলে চিকিৎসক সংগঠনগুলি তা সরকারের নজরে আনবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
ডেঙ্গি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। বিরোধীদের তরফে অতীতে রাজ্যের ডেঙ্গি পরিসংখ্যান প্রকাশ না করার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। একই সঙ্গে সরকারি চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে ‘ডেঙ্গি’ লেখার পরিবর্তে ‘অজানা জ্বর’ লেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। তবে এই অভিযোগগুলিকে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
এই প্রসঙ্গে চিকিৎসক অরুণাচল দত্ত চৌধুরী তাঁর পুরনো অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বর্তমান উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ২০১৭ সালে ডেঙ্গি আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় মৃত্যুসনদে রোগটির নাম উল্লেখ করতে না পারার অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছিল। পরে সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করার কারণে তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, জনস্বাস্থ্যের কোনও সমস্যার প্রকৃত বিস্তার না জানলে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।
প্রাক্তন স্বাস্থ্য অধিকর্তা অজয় চক্রবর্তীর মতও একই দিকে। তাঁর মতে, রোগের তথ্য প্রকাশ না করলে কোথায় সমস্যা বেশি, তা চিহ্নিত করা কঠিন। ডেঙ্গি প্রতিরোধ শুধুমাত্র স্বাস্থ্য দফতরের দায়িত্ব নয়; পুরসভা, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষকেও যুক্ত হতে হয়। সেই সমন্বয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ১ সেপ্টেম্বরের পর্যালোচনা বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, বর্ষার মরসুমে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সতর্কতা বজায় রাখা প্রয়োজন। সেই সময় রাজ্যে একটি মৃত্যুর কথাও তিনি জানিয়েছিলেন।
এখন স্বাস্থ্য দফতরের দৈনিক বুলেটিন কতটা নিয়মিত হয় এবং ভবিষ্যতে তাতে মোট আক্রান্ত, জেলা-ভিত্তিক সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর মতো আরও বিস্তারিত তথ্য যুক্ত করা হয় কি না, সেটিই নজরে থাকবে। আপাতত অন্তত ডেঙ্গি পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারি তথ্য নিয়মিত প্রকাশের একটি নতুন ব্যবস্থা শুরু হয়েছে।



