সরকারি হাসপাতালে বেড নেই? এবার অ্যাম্বুলেন্সে সরাসরি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠাবে সরকার, চিকিৎসা হবে বিনামূল্যে

সরকারি হাসপাতালে বেড না থাকলে রোগীকে আর অন্য হাসপাতাল খুঁজে হয়রান হতে হবে না। কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে বেড বুক করে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হবে রোগীকে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

সরকারি হাসপাতালে গিয়ে বেড না পেয়ে আর রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হবে না। সরকারি হাসপাতালে বেড বা ভেন্টিলেটর না থাকলে স্বাস্থ্য দফতরের ব্যবস্থাপনাতেই অ্যাম্বুলেন্সে রোগীকে পাঠানো হবে নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানেই মিলবে নিঃশুল্ক চিকিৎসা। সোমবার এই নতুন পরিষেবার কথা ঘোষণা করলেন পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (Sharadwat Mukhopadhyay)। তাঁর দাবি, সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে এক ছাতার নীচে এনে রোগীর হয়রানি বন্ধ করাই এই ব্যবস্থার লক্ষ্য।

স্বাস্থ্য দফতরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনও রোগী চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালে পৌঁছনোর পর যদি দেখা যায় সেখানে ভর্তি করার মতো বেড নেই, বিষয়টি আর রোগীর পরিবারকে নিজের দায়িত্বে সামলাতে হবে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই বিষয়টি কন্ট্রোল রুমকে জানাবে। এরপর স্বাস্থ্য দফতরের কন্ট্রোল রুম রাজ্যের সঙ্গে সমন্বয়ে থাকা বেসরকারি হাসপাতালগুলির মধ্যে কোথায় বেড খালি রয়েছে, তা খুঁজে দেখবে।

শারদ্বত জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলির সঙ্গে একাধিক দফায় বৈঠক হয়েছে। প্রায় আড়াই হাজার বেড সংরক্ষণের কথা আগেই জানানো হয়েছিল। ওই বেডগুলিতে সাধারণ মানুষের জন্য নিঃশুল্ক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে বলে স্বাস্থ্য দফতরের পরিকল্পনা।

এই পরিষেবার প্রথম ধাপ হিসেবে সোমবার এসএসকেএম হাসপাতাল (SSKM Hospital)-এর সঙ্গে কেপিসি হাসপাতাল (KPC Hospital)-এর সমন্বয় তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। অর্থাৎ এসএসকেএমে কোনও রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় বেড না থাকলে তাঁকে অন্যত্র পাঠানোর দায়িত্ব শুধুমাত্র রোগীর পরিবারের উপর থাকবে না।

পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হবে একটি নির্দিষ্ট কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে। এসএসকেএমে রোগী এলেন, কিন্তু ভর্তি করার মতো বেড পাওয়া গেল না—প্রথমে সেই তথ্য যাবে সংশ্লিষ্ট কন্ট্রোল রুমে। সেখান থেকে স্বাস্থ্য দফতরের কন্ট্রোল রুমকে জানানো হবে পরিস্থিতি।

এরপর কন্ট্রোল রুম বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে খালি বেডের খোঁজ নেবে। যে হাসপাতালে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী বেড পাওয়া যাবে, সেখানে কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমেই ভর্তি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এরপর সরকারি হাসপাতাল থেকেই অ্যাম্বুলেন্সে রোগীকে সরাসরি সেই বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে ‘রেফার রোগ’-এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সমস্যাটি দেখা যায়, অর্থাৎ রোগী ও তাঁর পরিবারের হাসপাতাল খুঁজে বেড়ানো, তা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। বিশেষ করে জরুরি অবস্থায় কয়েক ঘণ্টা বেডের সন্ধানে নষ্ট হওয়া আটকানোই এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।

তবে এই পরিষেবা শুধুমাত্র কলকাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেই জানিয়েছেন শারদ্বত। তাঁর দাবি, ধাপে ধাপে শহর, শহরতলি থেকে বাংলার গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এই সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের পরিকাঠামো তৈরি করা হবে। অর্থাৎ সরকারি হাসপাতালে জায়গার অভাবে রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতি যাতে না তৈরি হয়, সেই লক্ষ্যেই ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, আগামী দিনে আরও একাধিক সরকারি হাসপাতালকে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে এই সমন্বয় ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ, এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ (NRS Medical College), আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (RG Kar Medical College and Hospital), চিত্তরঞ্জন হাসপাতাল এবং সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (Sagar Dutta Medical College and Hospital)-সহ একাধিক সরকারি হাসপাতালকে ধাপে ধাপে এই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে রাজ্যের সব বেসরকারি হাসপাতাল এখনও এই ব্যবস্থার আওতায় আসেনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয় তৈরির চেষ্টা চলছে। কোন কোন হাসপাতাল এই পরিষেবার আওতায় রয়েছে, তার তালিকাও পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করা হবে।

এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করতে সোমবার একটি মক ড্রিলও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শারদ্বত। তাঁর দাবি, সেই মক ড্রিল সফল হয়েছে। ফলে পরীক্ষামূলক প্রস্তুতির পর পরিষেবাটি সোমবার থেকেই কার্যকর করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

সরকারি হাসপাতালের বেডের চাপ কমানোর পাশাপাশি রোগীর পরিবারের আর্থিক বোঝা কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে এই উদ্যোগে। সরকারি হাসপাতালে জায়গা না থাকায় কোনও রোগীকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার খরচ বহন করতে হবে না—সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমেই তাঁকে নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, একদিনে গোটা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নতুন ব্যবস্থাটি চালু হওয়ার পর কোথাও সমন্বয়ে সমস্যা হতে পারে, কোথাও ব্যবস্থার কোনও অংশে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। সেই সমস্যাগুলি চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে ঠিক করার কথাই জানিয়েছেন তিনি।

ফলে এখন নজর থাকবে নতুন এই সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল বেড সমন্বয় ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা দ্রুত কাজ করে তার দিকে। বিশেষ করে জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে বেড খোঁজার সময় কমানো এবং রোগীকে নিরাপদে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, আগামী দিনগুলিতে তারই পরীক্ষা হবে। সরকারি হাসপাতালে বেড না পেয়ে রোগী ও পরিজনদের হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘোরার পুরনো ছবি বদলানোই এখন স্বাস্থ্য দফতরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন