রকেটের গতিতে বাড়ছে সোনার দাম। প্রতিদিনই নতুন রেকর্ড, নতুন উচ্চতা। কিন্তু এই উল্লম্ফনের মাঝেই বিনিয়োগকারীদের মনে দানা বাঁধছে এক গভীর আশঙ্কা—এই মূল্যবৃদ্ধি কি সত্যিই বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা-সরবরাহের ফল, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে তোলা এক ‘বুদবুদ’? অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, ২০২৬ সালে এই বুদবুদ ফেটে গেলে বড়সড় সংশোধনের মুখে পড়তে পারে সোনার বাজার।
পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ২০২৫ সালেই সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। সাধারণ বাজার পরিস্থিতিতে এত বড় উল্লম্ফন বিরল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিই ইঙ্গিত দিচ্ছে—বাজারে অতিরিক্ত জল্পনা ঢুকে পড়েছে। অতীতে একাধিকবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়ে শেষ পর্যন্ত বড় পতন দেখা গেছে।
এই মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে বড় আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ, দাম যখন শীর্ষে থাকে, তখনই Goldman Sachs কিংবা JP Morgan-এর মতো সংস্থাগুলি ইতিবাচক রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেই রিপোর্টে বলা হয়, সোনার দাম আরও বাড়বে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সেই পূর্বাভাসে ভরসা করে উচ্চ দামে সোনা কিনে ফেলেন। ঠিক সেই সময়েই বড় বিনিয়োগকারীরা ধাপে ধাপে তাঁদের সোনা বিক্রি করে লাভ তুলে নেন। পরে দাম নামলেও তাঁরা থাকেন লাভেই—ক্ষতির বোঝা চাপতে থাকে খুচরো বিনিয়োগকারীদের কাঁধে।
স্বাভাবিকভাবে যে কোনও পণ্যের দাম নির্ধারিত হয় চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অভিযোগ উঠছে, লন্ডন ও নিউ ইয়র্কের কিছু বড় ব্যাঙ্ক যোগসাজশ করে সোনার দাম প্রভাবিত করছে। অতীতে এই অভিযোগ প্রমাণিতও হয়েছে। বিশেষ করে JP Morgan-এর বিরুদ্ধে ‘স্পুফিং’ কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
স্পুফিং কী?
এই কৌশলে বিপুল সংখ্যক ভুয়ো কেনা-বেচার অর্ডার দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য—বাজারে কৃত্রিম চাহিদার ইঙ্গিত তৈরি করা। দাম বাড়লেই সেই অর্ডার বাতিল করে আসল লাভ তুলে নেওয়া হয়। এই অপরাধে একসময় জেপি মরগানকে ৯২০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে হয়েছিল, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭,৬০০ কোটি টাকা।
ইতিহাসও এই ‘বুদবুদ ফাটার’ তত্ত্বকে উড়িয়ে দিচ্ছে না।
-
১৯৮০ সালে সোনার দাম চূড়ায় পৌঁছে পরে ৫৭ শতাংশ কমে যায়। আগের উচ্চতায় ফিরতে সময় লাগে প্রায় ২৫ বছর।
-
২০১১ সালে রেকর্ড দামের পর প্রায় ৪৫ শতাংশ পতন হয়। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সময় লাগে ৪ বছর।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ সতর্ক করছেন, ২০২৬ সালেও একই দৃশ্যপট তৈরি হতে পারে। যদি শেয়ার বাজারে বড়সড় ধস নামে, বিনিয়োগকারীরা নগদের জন্য সোনা ও রুপোর ETF বিক্রি শুরু করতে পারেন। সেক্ষেত্রে সোনা-রুপোর দামে একসঙ্গে বড় সংশোধন দেখা যেতে পারে।
এর প্রভাব ইতিমধ্যেই খুচরো বাজারে স্পষ্ট। বর্তমান দামে সোনা গরিব মানুষের নাগালের বাইরে। খুব শিগগিরই মধ্যবিত্তের হাত থেকেও তা সরে যেতে পারে। বিয়ের মরশুম চললেও সোনা কেনার পরিমাণ কমেছে। খুচরো বাজারে কেনাবেচা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটাই সবচেয়ে বড় সতর্ক সংকেত—যখন সাধারণ মানুষ বাজার থেকে সরে যায়, তখন দাম ধরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব হয় না।
🟡 কলকাতায় ২২ ক্যারেট সোনার দাম (আজ ও গতকাল)
| পরিমাণ | আজ | গতকাল | দাম পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| ১ গ্রাম | ₹ ১৬,০৬১ | ₹ ১৫,০৮১ | ▲ ₹ ৯৮১ |
| ১০ গ্রাম | ₹ ১,৬০,৬১১ | ₹ ১,৫০,৮০৬ | ▲ ₹ ৯,৮০৫ |
| ১ কেজি | ₹ ১,৯২,৭৩৩ | ₹ ১,৮০,৯৬৭ | ▲ ₹ ১১,৭৬৬ |
🟠 কলকাতায় ২৪ ক্যারেট সোনার দাম (আজ ও গতকাল)
| পরিমাণ | আজ | গতকাল | দাম পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| ১ গ্রাম | ₹ ১৭,৫৩৪ | ₹ ১৬,৪৬৪ | ▲ ₹ ১,০৭১ |
| ১০ গ্রাম | ₹ ১,৭৫,৩৪০ | ₹ ১,৬৪,৬৩৫ | ▲ ₹ ১০,৭০৫ |
| ১ কেজি | ₹ ২,১০,৪০৮ | ₹ ১,৯৭,৫৬২ | ▲ ₹ ১২,৮৪৬ |



