SIR বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতপার্থক্যের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের একাধিক নথিভুক্ত আপত্তির কথা প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে। এর মধ্যেই সেই অভিযোগের জবাব দিয়ে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, SIR-সহ গুরুত্বপূর্ণ কোনও সিদ্ধান্তই একতরফাভাবে নেওয়া হয়নি। তিন নির্বাচন কমিশনারের সম্মতিতেই সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দাবি কমিশনের।
বিতর্কের সূত্রপাত ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি প্রতিবেদনে। সেখানে দাবি করা হয়, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, SIR, নতুন ভোটারের নাম নথিভুক্ত করা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা পুনরায় যুক্ত করা, Form 6-এ পরিবর্তন এবং ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছিলেন।
ওই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, কিছু ক্ষেত্রে দুই কমিশনার এমন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশের বিরোধিতা করেছিলেন, যা তাঁদের সঙ্গে আলোচনা না করেই নেওয়া হয়েছিল বলে তাঁরা নথিভুক্ত করেছিলেন। Form 6-এ পরিবর্তন এবং ভোটার তালিকার ডেটাবেসের অ্যাক্সেস সংক্রান্ত বিষয়েও তাঁদের আপত্তির কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে এই ব্যাখ্যাকে সরাসরি খারিজ করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন সূত্রের বক্তব্য, কোনও সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট কমিশনারদের প্রশ্ন, পরামর্শ, আপত্তি বা ব্যাখ্যা চাওয়ার বিষয়টি প্রশাসনিক আলোচনার স্বাভাবিক অংশ। কোনও মতামত নথিভুক্ত হলেই সেটিকে ‘ডিসেন্ট’ বা কমিশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
কমিশনের দাবি, শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তগুলি গ্রহণ করা হয়েছে, তার ক্ষেত্রে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী—তিনজনেরই অনুমোদন ছিল। SIR-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াতেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন।
এই বিতর্কে ২০২৩ সালের Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners (Appointment, Conditions of Service and Term of Office) Act-এর ১৮ নম্বর ধারাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের কাজ যতদূর সম্ভব সর্বসম্মতভাবে পরিচালিত হবে। আবার কমিশনারদের মধ্যে কোনও বিষয়ে মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
The Indian Express-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই কমিশনার তাঁদের কিছু নোটে এই আইনি কাঠামোর উল্লেখ করে কমিশনের নামে জারি হওয়া বিভিন্ন যোগাযোগ ও সিদ্ধান্তে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়টি তুলেছিলেন। প্রতিবেদনে Form 6-এর পরিবর্তন, ভোটার ডেটাবেসের অ্যাক্সেস এবং পশ্চিমবঙ্গে SIR-সংক্রান্ত কিছু আপিলের প্রক্রিয়া নিয়েও তাঁদের প্রশ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে Form 6 নিয়ে আপত্তির বিষয়টি প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার জন্য ব্যবহৃত এই ফর্মে SIR-সংক্রান্ত অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। দুই কমিশনারের আপত্তির পরও পরিবর্তনটি কার্যকর ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভোটার তালিকা পরিচালনার সফটওয়্যার ERONet-এর অ্যাক্সেস নিয়ে দুই কমিশনার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ভোটার তালিকার পরিবর্তন সংক্রান্ত ক্ষমতা আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট স্থানীয় আধিকারিকদের কাছেই থাকা উচিত।
পশ্চিমবঙ্গের SIR নিয়েও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। The Indian Express-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, SIR-পরবর্তী ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নাম এবং পরবর্তী আপিলের প্রক্রিয়া নিয়ে কমিশনের ভিতরে প্রশ্ন উঠেছিল। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গে SIR-সংক্রান্ত অন্তর্ভুক্তি ও বর্জন নিয়ে বিপুল সংখ্যক আপিল এখনও বিচারাধীন রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতেই কমিশনের বক্তব্য নতুন করে সামনে এসেছে। কমিশন সূত্রের দাবি, ব্যক্তিগতভাবে কোনও কমিশনার কোনও বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু সেটি নিজে থেকে কমিশনের আনুষ্ঠানিক ‘ডিসেন্ট’ হয়ে যায় না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট সব মতামত বিবেচনা করা হয় এবং SIR-সহ কমিশনের সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মতভাবেই গৃহীত হয়েছে বলে তাদের দাবি।
এদিকে, প্রকাশিত রিপোর্টকে কেন্দ্র করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী নেতা বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে সরব হয়েছেন এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। তবে তাঁদের রাজনৈতিক অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য—দুই পক্ষের অবস্থানই এখনও পরস্পরের বিপরীত।
ফলে এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু শুধু SIR নয়, কমিশনের ভিতরে নথিভুক্ত মতামতগুলির চরিত্রও। দুই কমিশনারের লেখা আপত্তিগুলিকে সাধারণ প্রশাসনিক আলোচনার অংশ হিসেবে দেখা হবে, নাকি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকৃত মতপার্থক্যের নথি হিসেবে বিবেচনা করা হবে—তা নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য স্পষ্ট করেছে, SIR-সহ তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোনও এক ব্যক্তির নয়, তিন সদস্যের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত।



