কলকাতার বুকে বিশ্বের বৃহত্তম দুর্গামন্দির— শুধু ঘোষণা নয়, সোমবার নিউ টাউনে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মঞ্চ থেকেই দুর্গা অঙ্গনের সম্পূর্ণ রূপরেখা তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২ লক্ষ বর্গফুট জুড়ে বিস্তৃত মন্দির, ১,০০৮টি স্তম্ভ, ৫৪ মিটার উঁচু গর্ভগৃহ— সংখ্যার হিসেবেই নয়, ভাবনার ব্যাপ্তিতেও দুর্গা অঙ্গন যে এক ঐতিহাসিক প্রকল্প, তা স্পষ্ট করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
গত ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের সভা থেকে দুর্গা অঙ্গন তৈরির ঘোষণা করেছিলেন মমতা। সোমবার নিউ টাউনে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে তিনি জানালেন, কী ভাবে পরিকল্পিত হচ্ছে এই মন্দির, কী কী পরিকাঠামো থাকছে এবং কেন জমির পরিসর বাড়ানো হয়েছে।
দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের মতোই দুর্গা অঙ্গন নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে হিডকো। মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রথমে যে জমিটি চিহ্নিত করা হয়েছিল, তার আয়তন ছিল ১২ একর। কিন্তু প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি নিজেই পরামর্শ দেন আরও বড় জায়গা নেওয়ার। শেষ পর্যন্ত ১৭.২৮ একর জমিতেই চূড়ান্ত হয়েছে দুর্গা অঙ্গনের অবস্থান।

মমতার কথায়, এই দুর্গা অঙ্গন হবে বিশ্বের বৃহত্তম দুর্গামন্দির। মূল মন্দিরের আয়তন ২ লক্ষ বর্গফুট। চার দিকে থাকবে বিস্তৃত খোলা চত্বর ও সবুজে মোড়া পরিবেশ। দৈনিক যাতে প্রায় এক লক্ষ ভক্ত নির্বিঘ্নে দর্শন করতে পারেন, সেই হিসেবেই পরিকল্পিত হচ্ছে গোটা পরিকাঠামো।
মন্দির চত্বরে নকশা করা খিলান দিয়ে নির্মিত হবে ১,০০৮টি স্তম্ভ। গর্ভগৃহের উচ্চতা হবে ৫৪ মিটার। থাকবে ১০৮টি দেবদেবীর মূর্তি ও ৬৪টি সিংহমূর্তি। সিংহদুয়ারের পাশাপাশি থাকছে পবিত্র কুণ্ড। মূল দুর্গামন্দির ছাড়াও আলাদা করে নির্মিত হবে শিব, লক্ষ্মী, গণেশ, সরস্বতী ও কার্তিকের মন্দির।
বিশেষত্ব এখানেই শেষ নয়। মমতা জানান, এই দুর্গা অঙ্গনে ৩৬৫ দিনই দুর্গাপুজো হবে। গর্ভগৃহের বাইরের অংশে একসঙ্গে প্রায় এক হাজার মানুষের বসার ব্যবস্থা থাকছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা জায়গা, প্রসাদ ঘর এবং মন্দির সংলগ্ন গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
দুর্গা অঙ্গনের নির্মাণ ও ভবিষ্যৎ পরিচালনার জন্য রাজ্যের মুখ্যসচিবকে শীর্ষে রেখে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে। দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের ক্ষেত্রেও একই মডেল অনুসরণ করা হয়েছিল বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, দুর্গা অঙ্গনের তহবিলে ইতিমধ্যেই যে অর্থ জমা পড়েছে, তাতে দুর্গামূর্তি নির্মাণের খরচ উঠে গিয়েছে।

সোমবারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণেশ্বর মন্দির, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ, রামকৃষ্ণ মিশন কামারপুকুরের প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি চার্চ, বৌদ্ধমঠ, গুরুদ্বার ও মুসলিম ধর্মীয় প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ও মহামেডান ক্লাবের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতেও স্পষ্ট ছিল সর্বধর্ম সমন্বয়ের বার্তা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নৃত্য পরিবেশন করেন ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়। পরে সঙ্গীত পরিবেশন করেন শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়, বাবুল সুপ্রিয়, ইমন চক্রবর্তী ও ইন্দ্রনীল সেন। বিকেল ৩টা ৫৬ মিনিটে রিমোটের বোতাম টিপে দুর্গা অঙ্গনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলকের সামনে লাল রঙের উপর সোনালি সুতোয় কাজ করা একটি শাড়ি অর্পণ করেন তিনি। একই সঙ্গে হিডকোকে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
মমতা জানান, রাজ্যের দুর্গাপুজোকে UNESCO আবহমান ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেওয়ার পরই তিনি দুর্গা অঙ্গনের ভাবনা নিয়ে এগোন। সেই স্বীকৃতিকে সংরক্ষিত রাখতেই এই স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ। একই মঞ্চ থেকে তিনি ঘোষণা করেন, আগামী জানুয়ারি মাসেই শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দিরেরও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হবে।




