নজরবন্দি ব্যুরোঃ বিশ্ব চলচ্চিত্রের অঙ্গহানি, বাঙালি এবার বলিউড নিয়ে আদিখ্যেতাটা বন্ধ করুক৷ এবার একটু কম ‘আঞ্চলিক’ হয়ে বেশী মেনস্ট্রিম যা কিছু আছে তার দাবিদার হোক। নাকউঁচু হোক, নিজের ঐতিহ্য নিয়ে অহংকারী হোক। নিকারাগুয়ায় মুদ্রাস্ফীতি হলেও যে বাঙালি হেদিয়ে হ্যারিকেন হাতে হোক মিছিল করে, সে এবার নিজেরটা বুঝতে শিখুক। নিজের সম্পদগুলো জাহির করতে শিখুক। হ্যাঁ, নিজের ঢাক নিজের পেটানো পুজো বাদেও প্র্যাক্টিস করুন। এতে আখেরে বাংলারই লাভ।
আরও পড়ুনঃ ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে লোকাল ট্রেন পরিষেবা স্বাভাবিক করতে প্রস্তুত রেল।
বলিউডের এই বাঁহাতে নমঃ নমঃ করে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর ঢংটা মোটেও ভালো না। যে ভদ্রলোক কাল মারা গেলেন তিনি ‘হাউসফুল’,’ওম শান্তি ওম’ বা ‘দাবাং’ এ অভিনয় করেননি বলে যে তিনি পাতে দেওয়ারও যোগ্য না সেটা উচ্চস্বরে বলার সময় এসেছে। ওই যে বললাম নিজের ঢাক নিজের পেটানোর সময় এসেছে।
কোন মহারথি, আমির ও ওমরাহর টুইট পেলাম না সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মহা-প্রয়াণে। এনারা ও আমরা শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের কম্পিটিশন লাগিয়ে দিয়েছিলাম এক তরুন অভিনেতার অস্বাভাবিক মৃত্যুতে। ওতে টিআরপি ভালো।
শোনো হে ছম্মকছাল্লো, শোনো হে দিওয়ানা- মস্তানা, ৫০০ কোটির ক্লাবে ঢুকেও একখান লেজিওঁ দনর পেতে কিন্তু সেই মগজাস্ত্রই লাগে। এক্ষেত্রে জানিয়ে রাখি, লেজিওঁ দনর কোন ফরাসি সুগন্ধি না, সে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অর্জন করেছেন এটি। যেভাবে ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরঁ কলকাতা শহরে এসে সত্যজিৎ রায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন এই সম্মান। আপনি পান পরাগ কোম্পানিকে কয়েকশো কোটি দিলেও এটি বাগাতে পারবেন না। সবটা বক্স অফিস দেখিয়ে কেনা যায় না।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের অঙ্গহানি, মগনলাল মেঘরাজের কায়দায় ‘ইয়ে সোমিত্র বাংগাল কা কৌনো মেগা স্টার কি?” বলা বন্ধ করুন। অজ্ঞতা সর্বদা সুখকর নয়। আপনি কাশ্মীর কি কলিকে এক ঝলক দেখার জন্য যখন পাগল, এই ইনি তখন আগামীর কালজয়ী ফ্রেম উপহার দিয়েছেন ওই নায়িকাকে নিয়ে৷ আমরা ভালোবেসে ওদের অপু আর অপর্ণা বলি। বাইরের কোন ফেস্টিভ্যালে গেলে আজও যে সত্যজিৎ রায়ের নাম কপচান তার ১৪টা ছবির নায়ক এই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্গীয় রেনেসাঁর শেষ মিসিং লিংক।
বিশ্ববরেণ্য পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়া একবার বলেছিলেন— ‘শ্রীরায়ের ছবি না দেখা আর পৃথিবীতে চাঁদ আর সূর্য না দেখে বেঁচে থাকা একই ব্যাপার।’ সেই সূর্য আর চাঁদের নরম আলোর নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। হ্যাঁ বানিজ্য সফল মেনস্ট্রিম ছবির নায়কও ছিলেন ইনি।
আজ বিবিসি সহ একাধিক বিদেশি সংবাদমাধ্যম বা ব্যক্তিত্ব যখন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিয়ে লিখছে, তথাকথিত মেইনস্ট্রিম জনগোষ্ঠীর উদাসীনতা কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক করলো। সেই বিরক্তিটা নিজেদের নিয়েও। আমরাই হয়তো আমাদের সম্পদকে বড্ড প্রাদেশিক বানিয়ে রেখেছিলাম। কোনদিন চেষ্টাই করিনি বুক বাজিয়ে এই গল্পটা বলার যে এই সৌমিত্রর প্রতি শশী কপুরও ইর্ষান্বিত ছিলেন, তিনি নিজেও মনোযোগ দিয়ে বাঙালি ফেলুদার অভিনয় পর্যবেক্ষণ করেছিলেন নিজে হিন্দিতে ফেলুদা করবেন প্রস্তুতি নিয়ে।
বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাত। সত্যজিৎ একবার বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মালে তুলসী চক্রবর্তী অস্কার পেতেন। হয়তো আমরা সন্তোষ দত্ত, কামু মুখোপাধ্যায় নিয়েও ফিসফিস করে তাই বলি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো এই মাপের মানুষ কেন শেষদিন অবধি বাতের ব্যাথার তেল আর অমুকমন্ত্র যন্ত্র বিক্রি করলো সেই নিয়ে ঝড় না তুলে আসুন এটা ভাবি লোকটাকে আমরা অবাঙালিদের মাঝে একটা নাসিরুদ্দিন, একটা ইরফান খান বা নিদেনপক্ষে একজন নাওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকীরও মতো কি জনপ্রিয় করতে পেরেছি? আমাদের মনিমানিক্যগুলো কুক্ষিগত করে রেখে লাভটা কি যদি দেশই তার কদর না দেয়? পরের বার যে মগনলাল মেঘরাজের মতো ‘ইয়ে সৌমিত্র ট্রেন্ড কিউ করছিল? কৌনো লেজেন্ড আদমি ছিল কি?” বলবে তাকে দাঁড় করান, সরবত খাওয়ান, অর্জুনকে ডাকুন তারপর নাইফ থ্রোইং এর প্রাইভেট সার্কাস দেখান।
লেখাঃ ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ









