রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন কখনও হঠাৎ হয় না, হয় প্রস্তুতির ভিতর দিয়েই। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ঠিক তেমনই এক প্রস্তুতিমূলক চালেই আবার বঙ্গ বিজেপির (West Bengal BJP) রাজনৈতিক মানচিত্রে দৃপ্তভাবে ফিরে এলেন দিলীপ ঘোষ। দীর্ঘ নীরবতা, অভিমান ও আড়াল কাটিয়ে আগামী ৬ জানুয়ারি রানাঘাটের সভা থেকেই তাঁর রাজনৈতিক ‘কামব্যাক’—এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। আর সেই প্রত্যাবর্তন ঘিরেই শুরু হয়েছে জোর জল্পনা, দিলীপ ঘোষ কি তবে ভবিষ্যতে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হতে চলেছেন?
লোকসভা নির্বাচনে মেদিনীপুর কেন্দ্র থেকে টিকিট না পাওয়া এবং বর্ধমান–দুর্গাপুর আসনে পরাজয়ের পরে কার্যত আড়ালেই চলে গিয়েছিলেন বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি। দলীয় কর্মসূচিতেও তাঁকে দেখা যাচ্ছিল কম। কিন্তু নতুন বছরের শুরুতেই রাজনীতির ময়দানে ফের সক্রিয় তাঁর উপস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে—দিলীপ অধ্যায় এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এটি নিছক কোনও ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভাবনায় তৈরি একটি বৃহত্তর রণকৌশলের অঙ্গ। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলায় তিনটি মুখ—রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং দিলীপ ঘোষ—এই তিনজনকে সামনে রেখে ‘ত্রিফলা কৌশল’-এ ২০২৬-এর যুদ্ধে নামতে চাইছে। জনসংযোগে দক্ষ, সরাসরি আক্রমণাত্মক ভাষার জন্য পরিচিত দিলীপ ঘোষ এখনও দলের নিচুতলার কর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্য মুখ—এটা অস্বীকার করছে না বিজেপির অন্দরমহলও।

একটি ‘শাহি সফরেই’ ছবিটা অনেকটাই বদলে যায়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠক এবং মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ—এই দুই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয়, দিলীপ ঘোষকে ঘিরে তৈরি হওয়া দূরত্ব আপাতত ঘুচেছে। সেই থেকেই আবার বিজেপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক চর্চার কেন্দ্রে ফিরেছেন তিনি।
দলীয় সূত্রের খবর, ৩ থেকে ৫ জানুয়ারি মেদিনীপুরে সাংগঠনিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকবেন দিলীপ ঘোষ। তার পরেই ৬ জানুয়ারি রানাঘাটে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে এক মঞ্চে দেখা যাবে তাঁকে। এই সভাকেই দিলীপের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে দেখছে বঙ্গ বিজেপি।
এর পর রয়েছে টানা কর্মসূচি। ৭ জানুয়ারি বারাকপুর, ৮ জানুয়ারি কোচবিহার, ৯ জানুয়ারি জলপাইগুড়ি এবং ১০ জানুয়ারি মালদহ—এই সূচি মেনেই উত্তরবঙ্গ সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিটি সভাতেই দিলীপ ঘোষের সঙ্গে থাকবেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। আগে ঠিক ছিল ১৩ জানুয়ারি দুর্গাপুর থেকে নতুন করে সভা শুরু করবেন দিলীপ, তবে সেই পরিকল্পনা বদলে তাঁকে আগেভাগেই ময়দানে নামানোর সিদ্ধান্ত নেয় দল।
ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যাচ্ছে, উত্তরবঙ্গ নিয়ে এখনও যথেষ্ট আশাবাদী দিলীপ ঘোষ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর থেকেই উত্তরবঙ্গে বিজেপির সংগঠন শক্ত হয়েছে। যদিও কোচবিহারকে এখনও ‘চ্যালেঞ্জিং’ জেলা হিসেবেই দেখছেন তিনি। তবে এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার পরে ফল বিজেপির পক্ষে আরও অনুকূল হবে বলেই তাঁর বিশ্বাস।
এ দিকে ফেব্রুয়ারি থেকে রাজ্যে বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। সেই কারণে পরীক্ষার মরশুম শুরুর আগেই রাজ্য জুড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি সেরে ফেলতে চাইছে বিজেপি। প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে অন্তত একটি করে সভা করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষাকালীন সময়ে মাইক ব্যবহার করে বড় সভা না করে, সংগঠন মজবুত করতে ঘরোয়া বৈঠকের উপর জোর দেবে দল।
এর মধ্যেই জানুয়ারির মাঝামাঝি, সম্ভবত ১৭ বা ১৮ তারিখ, মালদহে প্রধানমন্ত্রীর সভার সম্ভাবনাও উসকে দিচ্ছে রাজনৈতিক পারদ। সেই সভাকে কেন্দ্র করেও প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে রাজ্য বিজেপি। নতুন বছরে এই রাজনৈতিক ব্যস্ততার মাঝেই দিলীপ ঘোষের প্রত্যাবর্তন বিজেপির অন্দরে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।



