আয়বহির্ভূত সম্পত্তি, বেআইনি লেনদেন এবং সম্পত্তি গোপনের অভিযোগে তদন্তের মুখে থাকা তৃণমূল নেতা দেবরাজ চক্রবর্তী হাইকোর্টে বড় ধাক্কা খেলেন। তাঁর আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দিল কলকাতা হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তদন্তে একাধিক নতুন তথ্য উঠে আসায় মামলাটি আরও জটিল মোড় নিয়েছে বলে মনে করছে তদন্তকারী মহল।
বুধবার বিচারপতি জয় সেনগুপ্তের এজলাসে মামলার শুনানিতে দেবরাজ চক্রবর্তীর আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করা হয়। আদালতে রাজ্যের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, খুনের হুমকি এবং বিপুল আর্থিক অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। তদন্তের স্বার্থে আরও তথ্য সংগ্রহ প্রয়োজন বলেও আদালতে জানানো হয়।
তদন্তকারী সূত্রে দাবি, দেবরাজ চক্রবর্তীর আয়বহির্ভূত সম্পত্তির পরিমাণ ১০০ কোটির টাকারও বেশি হতে পারে। অভিযোগ, নির্বাচনের আগে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি আত্মীয়স্বজন এবং পরিচিতদের নামে হস্তান্তর করা হয়েছিল। এছাড়াও জমি দখল, সম্পত্তি বিক্রি এবং নির্বাচনী হলফনামায় প্রকৃত সম্পদের বিবরণ না দেওয়ার অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মামলার তদন্তে সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হাতে পেয়েছে পুলিশ। অভিযোগ, দেবরাজ চক্রবর্তীর আর্থিক লেনদেনের একটি অংশ বিহারের বেগুসরাইয়ের বাসিন্দা রাম শর্মার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হত। সেই তথ্যের ভিত্তিতে বাগুইআটি থানার পুলিশ বিহার থেকে রাম শর্মাকে গ্রেফতার করে।
পরবর্তীতে তাঁকে বারাসত আদালতে পেশ করা হলে সাত দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, রাম শর্মার অ্যাকাউন্টে কী কারণে টাকা পাঠানো হত এবং সেই লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে বলে দাবি, মোট ২২টি সম্পত্তির খোঁজ মিলেছে। এর মধ্যে ১৯টি সম্পত্তি দেবরাজ চক্রবর্তীর নামে এবং তিনটি সম্পত্তি অদিতি মুন্সির নামে রয়েছে বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি।
শুনানির সময় বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত সেল ডিড এবং ডেভেলপমেন্ট ডিডে দেখানো আর্থিক হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নথিতে যেভাবে টাকার অঙ্ক দেখানো হয়েছে, তা অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং কৌশলী আর্থিক ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতে দাবি করেন, নির্বাচনের আগে প্রায় ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বিভিন্ন ব্যক্তি এবং বেনামি মালিকানার আওতায় স্থানান্তর করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনী হলফনামায় সম্পত্তির প্রকৃত পরিমাণ কম দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে অদিতি মুন্সির ঘোষিত আয় প্রায় ৪০.৯ লক্ষ টাকা এবং দেবরাজ চক্রবর্তীর আয় ৬৬ লক্ষ টাকার কিছু বেশি। সেই তুলনায় তাঁদের নামে বিপুল সম্পত্তির উৎস কী, তা নিয়েই এখন তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হয়েছে।
হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হওয়ার পর দেবরাজ চক্রবর্তীর আইনি সঙ্কট আরও গভীর হল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। আগামী দিনে তদন্তে আর কী কী তথ্য সামনে আসে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।



