উত্তরবঙ্গের বৃষ্টি পরিস্থিতি-র তীব্রতা ধীরে ধীরে কমছে। টানা কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ ও ধসের পর সোমবার সকালে দার্জিলিংয়ে দেখা গেল ভিন্ন ছবি। মেঘ সরিয়ে উঁকি দিয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফঢাকা চূড়া। বৃষ্টি পুরোপুরি থেমে যাওয়ায় পাহাড়ে নতুন করে জেগে উঠেছে আশা।
শনিবার রাত থেকে শুরু হওয়া প্রবল ঝড়বৃষ্টিতে উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সমতলে তাণ্ডবলীলা চলেছে। ডুয়ার্স থেকে দার্জিলিং, শিলিগুড়ি— সর্বত্র বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনজীবন। তবুও সোমবার সকাল পাহাড়ে এনেছে আশার আলো।
বৃষ্টি থেমে কাঞ্চনজঙ্ঘার রোশনাই দার্জিলিং আকাশে:
কোজাগরী পূর্ণিমার সকালেই দার্জিলিং শহরে বৃষ্টি পুরোপুরি থেমে যায়। সকাল থেকেই আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে শুরু করে, মেঘ সরতেই দেখা মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা সমাজমাধ্যমে সেই দৃশ্য শেয়ার করছেন।
দার্জিলিংয়ে পরিষ্কার আকাশ, দেখা মিলল কাঞ্চনজঙ্ঘার! বৃষ্টি কমায় উত্তরবঙ্গে স্বস্তি

স্থানীয়দের মতে, এমন পরিষ্কার আকাশ এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা বৃষ্টির মৌসুমে খুবই বিরল ঘটনা। আবহাওয়ার এই পরিবর্তন শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের মনই নয়, স্থানীয় পর্যটন শিল্পেও নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
২৬১ মিমি বৃষ্টিতে তাণ্ডব, অন্তত ২০ জনের মৃত্যু পাহাড়ে:
শনিবার রাত থেকে রবিবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দার্জিলিং ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় ২৬১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়, যা সাম্প্রতিক কালে নজিরবিহীন। এই প্রবল বৃষ্টিতে তিস্তা, তোর্সা, মহানন্দা-সহ উত্তরবঙ্গের প্রায় সব নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পায়।
ধসে বহু পাহাড়ি রাস্তায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভেঙে যায় একাধিক সেতু ও কালভার্ট। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মিরিক ও সুখিয়াপোখরিতে। সেখানেই আটকে পড়েছিলেন বহু পর্যটক। উত্তরবঙ্গের প্রশাসনিক সূত্রে খবর, এই দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২০ জন।
তবে সোমবার সকাল থেকেই আবহাওয়া উন্নতির দিকে, যা স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের কাছে বড় স্বস্তির খবর।
পর্যটকেরা নামতে শুরু করেছেন পাহাড় থেকে:
আবহাওয়া পরিষ্কার হতেই দার্জিলিং ও আশপাশের হোটেলগুলিতে থাকা পর্যটকেরা ধীরে ধীরে সমতলের দিকে নামতে শুরু করেছেন। যাঁদের সোমবার রাতে ট্রেন বা ফ্লাইট রয়েছে, তাঁরা ঝুঁকি না নিয়ে আগেই যাত্রা শুরু করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যাঁরা দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তাঁদের কাছেও এই সকালের রোদ মানে নতুন করে বাঁচার আশ্বাস। ধস ও বৃষ্টির আতঙ্কের পর এটাই প্রথম শান্ত সকাল দার্জিলিং পাহাড়ে।
শিলিগুড়ি ও সমতলেও বৃষ্টি কমেছে, মেঘ ধীরে ধীরে সরছে:
শিলিগুড়ি ও আশপাশের সমতল এলাকায় রবিবার রাতে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হলেও সোমবার সকাল থেকে ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। কোথাও হালকা বৃষ্টি হলেও দুপুর নাগাদ তা থেমে যায়।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার উত্তরবঙ্গের আট জেলায় বিক্ষিপ্ত ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা নেই, আলিপুরদুয়ার ছাড়া। এর ফলে নদীগুলির জলস্তর বৃদ্ধির সম্ভাবনাও কম বলে মনে করা হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি ও সমতল অঞ্চলে যে দুর্যোগ দেখা দিয়েছিল, তা একদিকে যেমন প্রাকৃতিক শক্তির তাণ্ডব, তেমনি সোমবার সকালের পরিষ্কার আকাশ মানুষকে মনে করিয়ে দিল— প্রকৃতি যেমন রূঢ়, তেমনি সে মায়াবতীও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েকদিন পাহাড়ে ভারী বৃষ্টি না হলে পর্যটন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তবে ধসপ্রবণ এলাকাগুলিতে সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।



