টলিপাড়ায় টেকনিশিয়ান নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে বড় বদলের ইঙ্গিত। এবার থেকে কোনও সিনেমা বা ধারাবাহিকের শুটিংয়ে কত জন টেকনিশিয়ান নেওয়া হবে, তা আর ঠিক করে দিতে পারবে না ফেডারেশন। প্রয়োজন অনুযায়ী টেকনিশিয়ান বাছাইয়ের দায়িত্ব থাকবে প্রযোজকদের হাতেই। একই সঙ্গে ফেডারেশনের অধীনে থাকা ২৭টি গিল্ডের নির্বাচন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর দু’দিনে সেই নির্বাচন সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি নন্দনে তথ্য–সংস্কৃতি দপ্তরের (Department of Information and Cultural Affairs) উদ্যোগে টলিউডের বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে বৈঠক হয়। সেই বৈঠকের কার্যবিবরণীতে টেকনিশিয়ান নিয়োগের ক্ষেত্রে ফেডারেশনের একতরফা সিদ্ধান্ত বন্ধ করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এতদিন কোনও শুটিংয়ে কত জন টেকনিশিয়ান প্রয়োজন, তা নিয়ে ফেডারেশনের নির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল। অতিরিক্ত টেকনিশিয়ান নিতে বাধ্য করার অভিযোগও উঠত বিভিন্ন সময়ে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টেকনিশিয়ান নিয়োগের জন্য কোনও প্রযোজক বা প্রযোজনা সংস্থার উপর চাপ তৈরি করা যাবে না। একই সঙ্গে গিল্ডের কার্ড হাতে পেতে দেরি হওয়ার কারণে কোনও টেকনিশিয়ানকে কাজ থেকে বঞ্চিত করাও যাবে না। অর্থাৎ কাজের সুযোগের ক্ষেত্রে কার্ড সংক্রান্ত জটিলতাকে বাধা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
সরকার স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা নতুন টেকনিশিয়ানদের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ সিদ্ধান্ত। ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (FTII), সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (SRFTI) এবং রূপকলা কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত গিল্ড কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা গিল্ড নির্বাচন নিয়েও নির্দিষ্ট সময়সীমা সামনে এসেছে। ফেডারেশনের অধীনে থাকা ২৭টি গিল্ডের নির্বাচন ৩১ অক্টোবর এবং ১ নভেম্বর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত এই নির্বাচন নিয়ে সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি। গিল্ডগুলির একাংশের বক্তব্য, সরকারি বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নির্বাচিত বোর্ড ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
রাজ্যে পালাবদলের পর থেকে ফেডারেশনের অফিস কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। এবার সেটিও দ্রুত চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে টলিউডের কাজের পরিবেশ উন্নত করা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রযোজকদের কাছ থেকে টেকনিশিয়ান ও কলাকুশলীদের বকেয়া পাওনা দ্রুত মেটানোর বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।
শুটিংয়ের সময়সীমা নিয়েও আপাতত পুরনো নিয়মই বহাল থাকছে। মেগা সিরিয়ালের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৪ ঘণ্টার শিফট এবং সিনেমার ক্ষেত্রে ৮ ঘণ্টার শিফট থাকবে। প্রয়োজন হলে নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত ওভারটাইম করা যাবে। তবে কোনও মতবিরোধ বা সমস্যা তৈরি হলে আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান করতে হবে। কোনও পরিস্থিতিতেই বিরোধের জেরে শুটিং বন্ধ বা আটকে দেওয়া যাবে না।
কলাকুশলীদের সংগঠন কাঠামোতেও নতুন সংযোজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জুনিয়র আর্টিস্ট, ডান্সার এবং কোরিয়োগ্রাফারদের জন্য পৃথক গিল্ড তৈরি করা হবে এবং সেই গিল্ডগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত টেকনিশিয়ান এবং শিল্পীকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, টলিপাড়ায় দীর্ঘদিনের শ্রমিক-প্রযোজক সম্পর্ক, গিল্ডের ভূমিকা এবং ফেডারেশনের ক্ষমতার কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। সরকারি বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি বাস্তবায়িত হলে টেকনিশিয়ান নিয়োগ থেকে গিল্ড নির্বাচন এবং শুটিং পরিচালনা—একাধিক ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম চালু হতে পারে।



