শূন্যের গেরো কাটাতে সিপিআইএমের নতুন কৌশল, উত্তরপাড়ায় ‘দিদিকে বলো’, মুর্শিদাবাদে শুভেন্দু-সুর!

উত্তরপাড়ায় ‘দিদিকে বলো’ মডেলে প্রচার, মুর্শিদাবাদে হিন্দু ভোট টানার সূক্ষ্ম বার্তা—শূন্য কাটাতে প্রতিপক্ষের কৌশল ধার করছে সিপিআইএম, মাঠে বদলাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

শূন্যের গেরো কাটাতে এবার কৌশল বদলে ফেলছে সিপিএম—উত্তরপাড়ায় প্রার্থী মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের প্রচারে দেখা যাচ্ছে ‘দিদিকে বলো’-র আদলে সরাসরি যোগাযোগের উদ্যোগ, আর মুর্শিদাবাদের একাধিক আসনে নিচুতলায় শোনা যাচ্ছে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক বার্তার প্রতিধ্বনি। প্রকাশ্যে না বললেও, বাস্তবে প্রতিপক্ষের মডেল ধার করেই এগোচ্ছে বামেরা—এই ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠছে মাঠের ছবিতে।

উত্তরপাড়ায় প্রচারে নতুন পরীক্ষায় নেমেছেন মিনাক্ষী। বাড়ি বাড়ি একটি বিশেষ কার্ড বিলি করা হচ্ছে, যেখানে একদিকে রয়েছে আরজি কর-কাণ্ডের প্রতিবাদী ছবি, অন্যদিকে প্রার্থীর নাম-সহ একটি ফোন নম্বর। বার্তা একটাই—সমস্যা থাকলে সরাসরি জানানো যাবে। এই উদ্যোগ অনেকটাই মনে করিয়ে দিচ্ছে রাজ্য সরকারের জনপ্রিয় ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচির কথা, যেখানে সাধারণ মানুষ ফোনে অভিযোগ জানাতে পারতেন। যদিও দলীয় নেতৃত্ব প্রকাশ্যে এই তুলনা মানতে নারাজ, কিন্তু মাঠের প্রচারে মিল অস্বীকার করা কঠিন।

এই কৌশলের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় অসন্তোষকে কাজে লাগানোর চেষ্টা। গত পাঁচ বছরে এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক কাঞ্চন মল্লিককে নিয়ে ‘অদৃশ্য’ থাকার অভিযোগ ঘুরেছে জনমানসে। সেই ক্ষোভকে সংগঠিত করে ভোটে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যেই সিপিএমের এই সরাসরি যোগাযোগের ফর্মুলা। দলীয় সূত্র বলছে, প্রার্থী নিজে না পারলেও তাঁর প্রতিনিধিরা ফোনে মানুষের সমস্যা শুনছেন—একই মডেল ‘দিদির দূত’-এর মতোই।

শূন্যের গেরো কাটাতে সিপিআইএমের নতুন কৌশল, উত্তরপাড়ায় ‘দিদিকে বলো’, মুর্শিদাবাদে শুভেন্দু-সুর!
শূন্যের গেরো কাটাতে সিপিআইএমের নতুন কৌশল, উত্তরপাড়ায় ‘দিদিকে বলো’, মুর্শিদাবাদে শুভেন্দু-সুর!

তবে এই কৌশল যে পুরোপুরি নতুন নয়, তা মানছেন দলের একাংশ। তাঁদের মতে, রাজনীতিতে কার্যকর মডেল ধার নেওয়াই স্বাভাবিক। অতীতে জমি আন্দোলনের ধাঁচ অনুসরণ করে যেমন ক্ষমতায় এসেছে তৃণমূল, তেমনই এখন সিপিএমও পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল বদলাচ্ছে। যদিও এই বাস্তবতা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে চান না নেতারা, কারণ রাজনৈতিক বার্তার ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি।

অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদের কয়েকটি নির্বাচনী কেন্দ্রে আরও সূক্ষ্ম কৌশল নিয়েছে বামেরা। যেখানে ১৮-৩০ শতাংশ পর্যন্ত হিন্দু ভোট রয়েছে, সেখানে নিচুতলার কর্মীরা একটি নির্দিষ্ট বার্তা ছড়াচ্ছেন—এই আসনগুলিতে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা কম, কিন্তু সিপিএমের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু ভোটভিত্তি রয়েছে। ফলে তৃণমূলকে হারাতে হলে হিন্দু ভোট একজোট হয়ে সিপিএমের পক্ষে যাওয়া উচিত। এই যুক্তি অনেকটাই মিলে যায় শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে, যদিও দলীয় স্তরে তা স্বীকার করা হচ্ছে না।

সিপিএমের জেলা নেতৃত্ব অবশ্য প্রকাশ্যে ধর্মের প্রশ্নকে এড়িয়ে চলার কথাই বলছে। তাঁদের দাবি, প্রচারে মূল ফোকাস রুটি-রুজি ও জীবিকার প্রশ্নে। কিন্তু নিচুতলায় ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে কি না, তা পুরোপুরি অস্বীকারও করছেন না নেতারা—যা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভোটের অঙ্কে বাস্তববাদী হিসাবই এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

এদিকে, সাম্প্রতিক অতীতও সিপিএমকে ভাবাচ্ছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪—একাধিক নির্বাচনে বাম ভোটের একটি বড় অংশ বিজেপির দিকে সরে গিয়েছে, এই বাস্তবতা এখন দল স্বীকার করতে শুরু করেছে। এমনকি শীর্ষ নেতৃত্বের সামনেই এই ‘ভুল’ নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্যও হয়েছে। ফলে এবার সেই ভোটব্যাঙ্ক ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তরপাড়া থেকে জলঙ্গি, লালগোলা—বিভিন্ন কেন্দ্রে তাই সিপিএম একদিকে সরাসরি জনসংযোগ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ভোটের অঙ্কে সূক্ষ্ম বার্তা ছড়াচ্ছে। প্রতিপক্ষের কৌশলকে নিজের মতো করে ব্যবহার করে শূন্য কাটানোর এই প্রয়াস কতটা সফল হবে, তার উত্তর মিলবে ভোটের ফল ঘোষণার দিনই।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন