দুর্গাপুজো ও কালীপুজোর পর এবার বাংলায় শুরু ছটপুজো উদ্যাপন। যদিও এই উৎসব মূলত অবাঙালিদের মধ্যে বেশি প্রচলিত, তবুও এখন বাংলাতেও ছটপুজো মানা হয় উৎসাহের সঙ্গে। ছটপুজো শুধু উৎসব নয়, সংসারের শান্তি, সুখ ও সমৃদ্ধির আশীর্বাদ চাওয়ার এক পবিত্র ব্রত। বিশ্বাস, নিয়ম এবং কঠোর সংযমই এই পূজার মূল মন্ত্র।
অনেকে মনে করেন ইচ্ছে হলেই ছটপুজো করা যায়। কিন্তু শাস্ত্র মতে, নিয়ম না মানলে ব্রত ফলপ্রদ হয় না। তাই ছটপুজোয় প্রতিটি ধাপ এবং উপাচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চার দিনের ছটপুজো: প্রতিটি দিনের আলাদা গুরুত্ব
ছটপুজো চলে টানা চারদিন ধরে। প্রথম দিন নহায় খায়, দ্বিতীয় দিন খরনা, তৃতীয় দিন সন্ধ্যা অর্ঘ্য ও শেষ দিন সূর্যোদয় অর্ঘ্য। প্রতিটি দিনের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিকতা।
প্রথম দিন সকালে স্নান করে পরিষ্কার পোশাকে মহিলারা ভাত, লাউয়ের তরকারি, চানা ডাল এবং নানারকম নিরামিষ সবজি রান্না করেন। কিন্তু এখানে একটি কঠোর নিয়ম—এই খাবারে একচুল নুনও চলবে না। যিনি ভক্তি সহকারে ব্রত রাখেন, তাঁকে বাদ দিয়ে সবাইকে এই খাবারই দুপুরে খেতে হয়। রাতে নিরামিষ কোনও খাবার খাওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয় দিন খরনার দিন। সারা দিন নির্জলা উপবাসের পর ভক্ত নারীরা সূর্য দেবতাকে ক্ষীর, রুটি ও কলা নিবেদন করেন। এরপর শুরু হয় ছটপুজোর গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ঠেকুয়া তৈরির কাজ। গমের আটা, গুড়-এর স্বাদে তৈরি এই প্রসাদ সূর্য দেবতাকে উৎসর্গ করা হয়।
সন্ধ্যা অর্ঘ্য: ডুবন্ত সূর্যের কাছে কৃতজ্ঞতার বার্তা
উৎসবের তৃতীয় দিনে সন্ধ্যায় ডুবন্ত সূর্যকে অর্ঘ্য দেওয়া হয়। নদী বা জলাশয়ে দাঁড়িয়ে ব্রতীরা প্রদীপ হাতে সূর্য দেবতা ও ছটী মাইয়ের কাছে প্রার্থনা করেন। তাঁদের বিশ্বাস, সূর্যই জীবন, আলো, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির দাতা।
ডালা সাজানোর কাজ শুরু হয় দ্বিতীয় রাত থেকেই। এই ডালায় থাকে বিভিন্ন ফল, ধানের শিষ, নারকেল, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঠেকুয়া। ব্রতের কঠোরতা এতটাই বেশি যে ভক্তরা প্রায় ৪০ ঘণ্টা নির্জলা উপবাসে থাকেন।
সন্ধ্যা অর্ঘ্যের শেষে প্রদীপ ভাসিয়ে দেওয়া হয় জলাশয়ের জলে। এই দৃশ্যের মধ্যেই রয়েছে আধ্যাত্মিকতা ও আবেগের পবিত্র সমাহার।
সূর্যোদয় অর্ঘ্যের মধ্যেই ব্রত পূর্ণতা পায়: শেষ দিনে সূর্য ওঠার আগেই ভক্তরা ফের নদীর ধারে যান। সেখানে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হয় চূড়ান্ত অর্ঘ্য। বিশ্বাস, এই অর্ঘ্যেই সংসারের সমস্ত কষ্ট, অশান্তি, অভাব কাটিয়ে সূর্য দেবতা আশীর্বাদ প্রদান করেন।
উপবাস ভাঙা হয় বাড়ি ফিরে। ভক্তরা ঠেকুয়া, আদা, জল ও গুড় খেয়ে ব্রত সমাপ্ত করেন। অনেক পরিবার মনে করেন, ছটপুজো করলে সংসারে সুখ, দাম্পত্য শান্তি এবং সন্তানের উন্নতি অবশ্যম্ভাবী।
ছটপুজো কেন এত শক্ত ব্রত? প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস অনুসারে, সূর্য দেবতা ও তাঁর শক্তি ছটী মাইয়ের কৃপায়ই সংসারে আসে শান্তি ও সন্তানের মঙ্গল। তাই ব্রত পালনকারীরা কোনও অবস্থাতেই নিয়মভঙ্গ করেন না।
এটাই ছটপুজোকে আলাদা মর্যাদা দেয়। ছট দেবীকে খুশি করা মানেই সংসারের সব সমস্যার অবসান—এই গভীর বিশ্বাসই ভক্তদের শক্তি।
আজকের বাংলায় ছটপুজোর সম্প্রসারণ: বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পূর্ব উত্তরপ্রদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ছটপুজো পালন করে আসছেন। কিন্তু এখন কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায়ও ছটপুজো রীতিমতো উৎসবের রূপ নিয়েছে। গঙ্গার ঘাট, বড় বড় জলাশয়—সব জায়গায় ভিড় চোখে পড়ার মতো।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বৈবাহিক সম্পর্কের মধুরতা ও সংসারের আর্থিক উন্নতির আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে ক্রমে বেশি করে এই ব্রতের দিকে টানছে।
ছটপুজো: সংসারের শ্রীবৃদ্ধির পথ
বাংলায় ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস গভীর হচ্ছে— ছটপুজোর নিয়ম মেনে ব্রত রাখলে সংসার ভরে ওঠে সুখ-সমৃদ্ধিতে। সূর্য দেবতা ও ছটী মাইয়ের আশীর্বাদে জীবন বদলে যেতে পারে—এই আশা নিয়েই মানুষ পালন করেন এই কঠিন ব্রত।



