রাজ্যে বিজেপি সরকারের ১০০ দিন পেরোতেই দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে কড়া বার্তা দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Shamik Bhattacharya)। তাঁর নামে লেখা একটি ‘জরুরি সতর্কবার্তা’ বিজেপির বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে পড়েছে বলে খবর। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে, দলের নীতি ও আদর্শের বাইরে গিয়ে কোনও ব্যক্তি দুর্নীতি বা অনৈতিক কাজে জড়ালে তার দায় দল নেবে না। পদ বা সাংগঠনিক পরিচয় নির্বিশেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে।
বার্তাটি রাজ্য, জেলা, অঞ্চল, মণ্ডল এবং বুথ স্তরের বিজেপি নেতা, কার্যকর্তা ও কর্মীদের উদ্দেশে লেখা হয়েছে। শুরুতেই দলের মূল আদর্শ হিসেবে সততা, স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং দেশসেবার সংকল্পের কথাও তুলে ধরা হয়েছে সতর্কবার্তায়।
শমীকের নামে প্রচারিত ওই বার্তায় দাবি করা হয়েছে, দলের বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের কিছু অনভিপ্রেত কর্মকাণ্ড এবং অনিয়মের তথ্য সম্প্রতি তাঁর নজরে এসেছে। সেই প্রেক্ষিতেই দলের ভিতরের প্রত্যেক স্তরের নেতা-কর্মীকে সতর্ক করা হয়েছে। বার্তার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, দলের নীতির বাইরে গিয়ে কেউ অনৈতিক বা দুর্নীতির কাজে যুক্ত হলে তার দায়ভার ভারতীয় জনতা পার্টি নেবে না।
দলের রাজ্য সভাপতির বার্তায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বিশেষ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অপকর্মের সামান্যতম প্রমাণ পাওয়া গেলেও পদ বা অবস্থান বিবেচনা না করে কঠোর সাংগঠনিক এবং প্রয়োজন হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সাংগঠনিক পদে থাকা কোনও নেতা বা প্রভাবশালী কর্মীকেও এই সতর্কতার বাইরে রাখা হচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত, দলের ভাবমূর্তি রক্ষার বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে বিজেপির ভাবমূর্তি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দলের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কর্মী-সমর্থকদের যে ত্যাগ ও পরিশ্রম, কোনও ব্যক্তির কাজের কারণে যাতে তার মূল্য নষ্ট না হয়, সেই বার্তাও দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে জনসেবাকে। সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করাকেই প্রত্যেক কার্যকর্তার দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, সরকারে আসার পর প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত নেতা-কর্মীদের আচরণ ও কাজকর্ম নিয়ে দল যে বাড়তি সতর্ক, বার্তায় তারই ইঙ্গিত মিলেছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় সংগঠনের ভাবমূর্তি নিয়ে সতর্ক হয়েছে দলীয় নেতৃত্ব। বিশেষ করে তোলাবাজি, দুর্নীতি কিংবা গোষ্ঠীসংঘাতের মতো অভিযোগ যাতে সরকারের ভাবমূর্তির উপর সরাসরি প্রভাব না ফেলে, সেজন্য প্রথম থেকেই কড়া অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছেন শমীক।
তবে সতর্কবার্তা জারি করেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে বিজেপির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশ্যে আসছে বলে দলের অন্দরেই আলোচনা রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে এবার মৌখিক সতর্কবার্তার বদলে লিখিত বার্তা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে দিয়ে দলের সর্বস্তরের কাছে নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া হল বলে মনে করা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত শমীকের এই বার্তা বিজেপির সংগঠনের ভিতরে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার। সরকারে আসার পর দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে কী ভাবে সামলানো হয়, তার উপর অনেকটাই নির্ভর করবে নতুন সরকারের ভাবমূর্তি। ‘দুর্নীতির দায় দল নেবে না’—রাজ্য সভাপতির এই কড়া অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



