বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ক্ষোভ ও অসন্তোষের বিস্ফোরণ যেন থামছেই না। একের পর এক নেতা প্রকাশ্যে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন। এবার তৃণমূলের মুখপাত্র বিশ্বজিৎ দেব এমন মন্তব্য করলেন, যা রাজনৈতিক মহলে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। শুধু দলের ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন তোলেননি, একই সঙ্গে তৃণমূল ছাড়ারও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
বিশ্বজিৎ দেবের দাবি, গত কয়েক বছরে দলের ভিতরে দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যা সাধারণ কর্মী থেকে নেতৃত্ব— কারও অজানা ছিল না। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, দলের মধ্যে কার্যত দুটি আলাদা শক্তিকেন্দ্র তৈরি হয়েছিল। একদিকে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে থাকা গোষ্ঠী, অন্যদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী বলয়। এই বলয়ের বাইরে সাধারণ নেতা, কর্মী এমনকি জনপ্রতিনিধিদেরও গুরুত্ব দেওয়া হত না বলে দাবি তাঁর।
বিশ্বজিৎ দেবের তোপের মুখে পড়েছে দলের নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণকারী সংস্থা আইপ্যাকও। তাঁর বক্তব্য, একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না রেখে কর্পোরেট ধাঁচে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিচালনা করা গণতান্ত্রিক দলীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী। সেই কারণেই সংগঠনের ভিতরে দূরত্ব ও অসন্তোষ ক্রমশ বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
প্রবীণ এই নেতার দাবি, দলের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং সাংগঠনিক সমস্যার বিষয়ে তিনি বহুবার সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই কথা গুরুত্ব না পেয়ে উল্টে তাঁকেই কোণঠাসা করা হয়। এর জেরে গত কয়েক বছর ধরে তিনি কার্যত দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন।


দলের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়— উভয়কেই দায় নিতে হবে বলে মনে করেন বিশ্বজিৎ দেব। তাঁর বক্তব্য, নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণেই সংগঠনের ভিত দুর্বল হয়েছে এবং সেই প্রভাব ভোটের ফলাফলেও স্পষ্ট হয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আগামী দিনে তৃণমূল আরও ভাঙনের মুখে পড়তে পারে। তাঁর দাবি, দলের একাংশ কংগ্রেসে, কেউ বিজেপিতে, আবার কেউ বাম শিবিরে যোগ দিতে পারেন। একসময় যেভাবে কংগ্রেস বা সিপিএমকে ‘সাইনবোর্ডের দল’ বলে কটাক্ষ করা হত, ভবিষ্যতে তৃণমূলের অবস্থাও সেদিকেই যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন তৃণমূলের অন্যতম পরিচিত মুখের এমন মন্তব্য যে দলীয় অস্বস্তি আরও বাড়াবে, তা বলাই যায়। তবে বিশ্বজিৎ দেবের এই মন্তব্যের জবাবে তৃণমূল নেতৃত্ব কী অবস্থান নেয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



