বিহারের রাজনীতিতে নতুন মোড়। বিরোধী জোটে বড় ধাক্কা লেগেছে নির্বাচনের ঠিক আগে। আরজেডি (RJD) ও কংগ্রেস (Congress)-এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (JMM) ঘোষণা করেছে— তারা বিহার নির্বাচনে এবার স্বাধীনভাবে লড়বে। এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যে বিরোধী ঐক্যের ছবিতে বড় চিড় ধরা পড়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বিহারের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ আসনে JMM প্রার্থী দেবে— ধামদহ, চকাই, কাটোরিয়া, মনিহারি, জামুই এবং পিরপৈন্তি। এর মধ্যেই রয়েছে এমন কিছু এলাকা যেখানে সংখ্যালঘু ও আদিবাসী ভোটের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। ফলে, এই পদক্ষেপ বিরোধী শিবিরে অস্বস্তি বাড়াতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান।
কেন ভাঙল জোটের সমীকরণ? দলীয় মুখপাত্র সুপ্রিয় ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, আসন বণ্টন নিয়ে আরজেডি ও কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে বারবার আলোচনার পরও সমঝোতা হয়নি। তাঁর কথায়, “আমরা আরজেডি-র মাধ্যমে কংগ্রেস হাইকমান্ডের কাছে আমাদের দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। তাই দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে— ৬টি আসনে একাই লড়বে JMM।”

তিনি আরও বলেন, “২০১৯ সালের লোকসভা এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে আমরা কংগ্রেস ও আরজেডিকে সমর্থন করেছিলাম। এমনকি ঝাড়খণ্ডে নিজেদের কিছু আসনও ওদের জন্য ছেড়েছিলাম। কিন্তু এখন যখন আমাদের দাবি রাখার সময় এল, তখন সেই প্রতিদান পাইনি।”
এই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত জোট থেকে সরে আসার প্রধান কারণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিহার ভোটে নতুন সমীকরণ: বিহার নির্বাচনের আগে বিরোধী ঐক্যকে ভাঙতে পারে JMM-এর এই সিদ্ধান্ত। RJD ও Congress— দুই দলই এতদিন ধরে ‘INDIA’ জোটের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে এসেছে। কিন্তু JMM-এর মতো আঞ্চলিক শক্তির সরে আসা তাদের ভোট ব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত দক্ষিণ বিহার এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে, যেখানে ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে।
এমন অবস্থায় রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, BJP এই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইবে। কারণ, বিরোধী জোটে ফাটল মানেই ভোট বিভাজন, যা সরাসরি উপকৃত করতে পারে বিজেপিকে।
অমিত শাহর সফরের মাঝেই এই ফাটল: ঠিক এমন সময়েই তিন দিনের বিহার সফরে রয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। তিনি ইতিমধ্যেই পাটনায় পৌঁছে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার (Nitish Kumar)-এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিজেপির ভোট প্রচারে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ হলেও, JMM-এর সিদ্ধান্ত তাৎপর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শাহের সফরের মাঝেই বিরোধী শিবিরে এই বিভাজন বিজেপির প্রচারে বাড়তি গতি আনতে পারে। কারণ, বিরোধী ঐক্যই ছিল NDA-র মুখোমুখি হওয়ার প্রধান অস্ত্র। এখন সেই ঐক্য ভেঙে পড়ায় NDA-র অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: ভবিষ্যতের সম্ভাবনা কী? JMM ঐতিহাসিকভাবে ঝাড়খণ্ডের রাজনীতি কেন্দ্রিক একটি দল হলেও, বিহারে তাদের প্রভাব সীমিত। তবুও, নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে তাদের ভোট ব্যাঙ্ক রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাকেশ ঝা বলেন, “JMM-এর এই সিদ্ধান্ত হয়তো সামগ্রিকভাবে বিরোধী শিবিরের ক্ষতি করবে না, কিন্তু বার্তা হিসেবে এটি ভয়াবহ। ভোটাররা বিভক্ত নেতৃত্বকে সমর্থন করতে দ্বিধা করেন।”
অন্যদিকে, RJD শিবির থেকে এখনও পর্যন্ত এই প্রসঙ্গে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি জানিয়েছেন, “আমরা চাইছিলাম ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে, কিন্তু কিছু বিষয় নিয়ে মতভেদ ছিল। এখন সেই অবস্থান পর্যালোচনা করা হচ্ছে।”
রাজনৈতিক প্রভাব: কে লাভবান, কে ক্ষতিগ্রস্ত? একদিকে JMM নিজের শক্তি প্রদর্শন করতে চায়, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরে ফাটল দেখে BJP ও JD(U) খুশি। NDA শিবির মনে করছে, বিরোধীদের বিভাজন মানেই সরাসরি সুবিধা। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এটি বিরোধীদের একজোট হওয়ার শেষ নয়; নির্বাচনের আগে ফের জোটবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে এই মুহূর্তে স্পষ্ট, বিহারে বিরোধী জোটে ফাটল পড়ায় রাজনৈতিক আবহ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। অমিত শাহের প্রচার, নীতীশ কুমারের ভূমিকা এবং বিরোধী দলের নতুন কৌশল— সব মিলিয়ে বিহার রাজনীতি আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে।



