পশ্চিম সিকিমের নির্জন পাহাড়ি গ্রাম বারিয়াখোপ এখন ধীরে ধীরে ভ্রমণপিপাসুদের নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠছে। কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য, মেঘে মোড়া পাহাড়, পাইন বন আর নিরিবিলি পরিবেশ— সব মিলিয়ে এই অফবিট গ্রাম যেন শহুরে ক্লান্তি ভুলে থাকার এক নিখুঁত ঠিকানা। যারা ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির একান্ত সান্নিধ্যে কয়েকটা দিন কাটাতে চান, তাঁদের জন্য বারিয়াখোপ হতে পারে সেরা গন্তব্য।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত বারিয়াখোপ মূলত লেপচা এবং ভুটিয়া সম্প্রদায়ের মানুষের বসতি। পশ্চিম সিকিমের রিনচেনপং এবং বর্মিয়কের খুব কাছেই এই গ্রামের অবস্থান হলেও এখনও বাণিজ্যিক পর্যটনের অতিরিক্ত ভিড় এখানে পৌঁছয়নি। সেই কারণেই এখানকার শান্ত পরিবেশ এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক সৌন্দর্য আজও অক্ষত রয়েছে।


গ্রামের সরু পাহাড়ি রাস্তার দু’ধারে চোখে পড়ে পাইন, ওক এবং রডোডেনড্রনের ঘন জঙ্গল। বসন্ত এলেই রডোডেনড্রনের লাল ও গোলাপি ফুলে গোটা পাহাড় যেন রঙিন হয়ে ওঠে। মেঘ আর রোদের লুকোচুরিতে এই পাহাড়ি জনপদ দিনের বিভিন্ন সময়ে বদলে নেয় নিজের রূপ।

তবে বারিয়াখোপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য। ভোরের আলোয় বরফঢাকা শৃঙ্গে সূর্যের প্রথম কিরণ পড়ার মুহূর্ত এখানে এক অন্য অনুভূতি তৈরি করে। অনেক পর্যটকের মতে, হোমস্টের বারান্দায় বসে কাঞ্চনজঙ্ঘার রং বদলানো দেখা এই সফরের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
প্রকৃতিপ্রেমীদের পাশাপাশি পাখিপ্রেমীদের কাছেও বারিয়াখোপ খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সকালবেলা পাহাড়ি পাখির ডাক আর নির্জন পরিবেশ এই গ্রামকে আরও বিশেষ করে তোলে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে, যা বার্ড ওয়াচারদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ।


অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্যও রয়েছে ট্রেকিং এবং হাইকিংয়ের সুযোগ। ছোট ছোট পাহাড়ি ট্রেইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাওয়া যায় জঙ্গলের গভীরে। কাছাকাছি রয়েছে ছোট ঝরনা এবং একটি প্রাচীন গুম্ফা, যা স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃতির মেলবন্ধনের সুন্দর উদাহরণ।
বারিয়াখোপে বড় হোটেল না থাকলেও স্থানীয়দের পরিচালিত হোমস্টেগুলিই পর্যটকদের প্রধান ভরসা। কাঠের তৈরি পাহাড়ি ঘর, জানলার বাইরে মেঘে ঢাকা পাহাড় আর ঘরোয়া আতিথেয়তা— সব মিলিয়ে এখানকার থাকার অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। স্থানীয় অর্গানিক সবজি, পাহাড়ি খাবার, থুকপা ও মোমোর স্বাদও পর্যটকদের বিশেষভাবে টানে।
শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে গাড়িতে জোড়থাম হয়ে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় বারিয়াখোপে। সময় লাগে প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়টাকে এখানে ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ধরা হয়, কারণ এই সময়ে আকাশ পরিষ্কার থাকায় কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। আবার মার্চ-এপ্রিল মাসে রডোডেনড্রনের রঙিন সৌন্দর্য দেখতে অনেকেই ছুটে আসেন এই পাহাড়ি গ্রামে।
যান্ত্রিক শহুরে জীবন থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে যদি পাহাড়ের নীরবতা, ঠান্ডা হাওয়া আর মেঘেদের সঙ্গে সময় কাটাতে চান, তাহলে পশ্চিম সিকিমের অফবিট গ্রাম বারিয়াখোপ আপনার ট্রাভেল লিস্টে অবশ্যই জায়গা পাওয়ার যোগ্য।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



