সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুসংবাদ বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় পৌঁছনোর পর থেকেই বাংলাদেশ জুড়ে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী ঢাকা-সহ বিভিন্ন শহরে রাতভর বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কার্যত অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পরিস্থিতির অবনতি বুঝে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় শোকও ঘোষণা করা হয়। তবে রাত গড়াতেই সেই আবেদন কার্যত উপেক্ষিত থাকে—সরকারি ভবন, রাজনৈতিক দফতর এবং ঐতিহাসিক স্থাপনায় হামলার খবর আসে।

ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি—যেখানে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান-এর স্মৃতি জড়িত—সেখানে নতুন করে ভাঙচুর হয়। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-র দল আওয়ামী লীগের দফতরও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। বিভিন্ন জায়গায় শেখ হাসিনা ও ভারত-বিরোধী স্লোগান শোনা যায়।
সাংবাদিকদের উপর হামলা, প্রাণহানির অভিযোগ
উত্তেজনার রোষ থেকে সাংবাদিকরাও রেহাই পাননি। ঢাকায় প্রথম আলো ও দ্য ডেলি স্টার-এর দফতরে ভাঙচুরের পর আগুন ধরানোর অভিযোগ ওঠে। বিবিসি বাংলা-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, দমকল আগুন নেভানোর পরে ভিতরে আটকে পড়া সাংবাদিকদের উদ্ধার করা হয়। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে অভিযোগও তুলেছেন একাংশ।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রাণহানির অভিযোগও সামনে এসেছে। খুলনায় এক সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ময়মনসিংহে এক যুবককে পিটিয়ে মারার খবর মিলেছে। চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক যুবককে মারধরের অভিযোগ ওঠে কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধে। রাজশাহীতেও আওয়ামী লীগের দফতর ও মুজিবের আরেকটি বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।


ছায়ানটে হামলা, সাংস্কৃতিক পরিসরে উদ্বেগ
গভীর রাতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট-এর দফতরে সংগঠিত হামলার অভিযোগ ওঠে। ভাঙচুর ও লুটপাটের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও লালনের ছবি-বই নষ্ট করার অভিযোগ করা হয়েছে। ইউনেস্কো স্বীকৃত নববর্ষ উৎসব আয়োজনকারী এই প্রতিষ্ঠানে হামলা সাংস্কৃতিক পরিসরে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কীভাবে শুরু—গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মৃত্যুর খবর
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হাদি গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরনো পল্টনে গুলিবিদ্ধ হন। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিত হয়।

সরকারের অভিযোগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক নেতার গুলিতেই হাদি আহত হন। পুলিশ ও র্যাব জানিয়েছে, ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং একাধিক গ্রেফতারও হয়েছে। অভিযুক্তদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তদন্ত এখনও চলছে।

কে ছিলেন হাদি
বরিশালে জন্ম, মাদ্রাসা শিক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়া—হাদির উত্থান মূলত ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়। ইনকিলাব মঞ্চ গড়ে তিনি দ্রুত পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। হাসিনা-বিরোধী আন্দোলন, তীব্র বক্তৃতা ও সমাজমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি তাঁকে সমর্থক যেমন দিয়েছে, তেমন সমালোচনাও ডেকেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে শিক্ষক, স্বামী ও এক সন্তানের পিতা হাদি আগেই প্রাণনাশের হুমকির কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়েছে, তা আইনশৃঙ্খলা ও আসন্ন নির্বাচনের সময়সূচি—দু’টিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা
শুক্রবার সকাল থেকে ঢাকার শাহবাগ-সহ একাধিক এলাকায় ব্যারিকেড দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালালেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। হাদির মরদেহ ঢাকায় পৌঁছনোর পরে শ্রদ্ধা জানাতে জনসমাগমও বাড়ে। এই প্রেক্ষাপটে নির্ধারিত ভোট নির্ঝঞ্ঝাটে হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।







