সাবাস বাংলা দেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া ফারুক-রশীদ-ডালিমরাও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁদের নাতি-নাতনিরা কোটার সুযোগ পেতে পারে কি? এই লেখা যখন লিখতে বসলাম, ১৮ই জুলাই, ভারতীয় সময় বেলা ১২ টা ২৫, ২০২৪ সাল। তখনও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রে। মুজিবের দেশে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অর্ক সানা (সম্পাদক, নজরবন্দি.ইন): “সাবাস বাংলা দেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।” বিশ্ববিখ্যাত কবি তথা বাংলার গর্ব সুকান্ত ভট্টাচার্য, কবিতাটি লিখেছিলেন অন্য এক প্রেক্ষিতে। কিন্তু সেই কবিতা ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে আবার স্বার্থকতা পাচ্ছে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের সৌজন্যে। এই লেখা যখন লিখতে বসলাম, ১৮ই জুলাই, ভারতীয় সময় বেলা ১২ টা ২৫, ২০২৪ সাল। তখনও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রে। মুজিবের দেশে।

সাবাস বাংলা দেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ ছিলেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক। গতকাল সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি।

শিক্ষক তুহিন ওয়াদুদ ও তাঁর সহকর্মীরা আবু সাঈদের লাশ নিয়ে যখন বাড়িতে গেলেন, শুনলেন তাঁর স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ। মা মনোয়ারা বেগম বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন, বলছিলেন, ‘মোর বাবাটাক পুলিশ গুলি করিয়া মারল ক্যান, চাকরি চাওয়াটা কি অপরাধ?’

কোটাবিরোধীরা কোটা তুলে দিতে বলছেন না, তাঁদের দাবি যৌক্তিক কোটা সংস্কার। বাংলাদেশ সরকার, অর্থাৎ শেখ হাসিনার সরকারও নাকি চাইছে সংস্কার হোক। প্রশ্ন হল, সবাই যেখানে সংস্কার চায়, সেখানে এত রক্ত কেন? সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের বিষয়ে ছাত্রসমাজ সর্বোচ্চ আদালত থেকে ন্যায়বিচারই পাবে, এমন বিশ্বাসের কথা বলেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই আদালতের রায় আসা পর্যন্ত পড়ুয়াদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু একদিকে যখন হাসিনা ধৈর্য ধরার কথা বলছেন, তখন অন্যদিকে তারই সরকারের পুলিশ গুলি চালাচ্ছে পড়ুয়াদের বুকে!

সাবাস বাংলা দেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়

সাধারণ ছাত্রদের কোটা সংস্কারের আন্দোলন যৌক্তিক। সরকার এই যৌক্তিক সমস্যার সমাধান না করে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ আর পুলিশ পাঠিয়ে যে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করল এবং সর্বশেষ যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করল, তার দায় সরকারকে নিতে হবে না? আহমদ ছফা বলেছিলেন, একজন মানুষের অপমৃত্যুতেও আকাশ ভেঙে পড়া উচিত। বাংলাদেশের ছয়টা আকাশ ১৬ জুলাই ২০২৪ ভেঙে পড়েছে। তাতেও কি বুক কেঁপে ওঠেনি মুজিব কন্যার? কোটা সংস্কার আন্দোলন তো মুজিব হত্যাকারীদের বিরুদ্ধেও। সেটা কি বুঝতে পারছেন না তাঁর কন্যা?

সাবাস বাংলা দেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়

এত হানাহানি? এত মৃত্যু কি এড়ানো যেতনা? যেত। কিন্তু ঐযে সদিচ্ছার অভাব। শুভবুদ্ধি প্রয়োগ নাকরে প্রয়োগ করা হলো দমন-নিপীড়নের পথ। আজকেই যদি সরকার ঘোষণা দেয়, কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া হলো, কমিশন গঠন করে দেওয়া হলো। তাহলে আজই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু সেই সমাধানের পথে পা বাড়াচ্ছে না বাংলাদেশ সরকার। বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো ছাত্রের বুকে গুলি মেরে হত্যা করার পর সরকার বলছে ধৈর্য ধরতে! গুলি চালানোর আগে ধৈর্য ধরার কথা মনে ছিলনা?

সাবাস বাংলা দেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়
সাবাস বাংলা দেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়

মুক্তিযোদ্ধা কোটার যৌক্তিক সংস্কার কি দরকার নেই? দরকার। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারগুলোর ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। কোনো জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধা তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম তাঁর কারণে চাকরি পেতে দেখলে যদি সম্মান পান, সেই সুযোগ তিনি পেতে পারেন, কিন্তু সেটাও একটা যৌক্তিক পরিমাণে হতে হবে। নেতাদের ভুল কথা, ভুল আচরণ, দুর্নীতি, অগণতান্ত্রিক আচরণের ঢাল হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহারের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বিদ্যমান বাংলাদেশে। একবার মুক্তিযোদ্ধা মানে চিরকাল মুক্তিযোদ্ধা সবাই? বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া ফারুক-রশীদ-ডালিমরাও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁদের নাতি-নাতনিরা কোটার সুযোগ পেতে পারে কি?

bangladesh 5

আবার বাবা-দাদা মুসলিম লীগ করত, ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন— এমন অনেকেই আছেন। বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, কিন্তু ছেলে বা মেয়ে পাকিস্তানবাদের ধ্বজাধারী হয়েছে, স্বাধীনতার বিরোধী শক্তির রাজনীতিতে যোগ দিয়েছে, এমনও আছে। তাই আক্রমণ করে, দমননীতি দিয়ে এত জনপ্রিয় একটা আন্দোলন দমন করা যাবে না। সাময়িকভাবে রাজপথ ফাঁকা করে দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীদের মনে ক্ষোভ এবং তাঁদের পিঠে মারের দাগ থেকে যাবে।

সাবাস বাংলা দেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়

সাবাস বাংলা দেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়

কোটা সংস্কারের দাবি ন্যায়সংগত। কোটার নামে মেধাবীদের বঞ্চিত করা জুলুম। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী কোটা প্রাপ্যদের সঙ্গে সংগতি রেখে ন্যায়ানুগ অনুপাতে আলোচনার মাধ্যমে কোটা সংস্কার করে বিদ্যমান সংকট ও অস্থিরতার নিরসন করা সম্ভব। তাই বর্তমানের এই মুখোমুখি অবস্থান, মারামারি, রক্তক্ষরণ কিছুতেই কাম্য ছিল না। বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী কোটাপ্রথার সংস্কার চান, মেরে–পিটিয়ে তাঁদের চুপ করানো যাবে না। আর যদি চুপ করানো সম্ভব হত, তাহলে গতকালের ছয়টা লাশ যথেষ্ট ছিল, আন্দোলনকারীদের চুপ করানোর জন্যে…

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর গতকালের ভাষণ নিয়ে… যাই হোক, ছাত্র হত্যার মত কান্ড ঘটানোর পর, চরম অস্থিরাবস্থার মধ্যে, অত্যন্ত বেদনা-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তাঁর সরকারের নানা কির্তীর কথা তুলে ধরতে ভোলেননি প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে সরকার সক্ষম হয়েছে। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ব্যবহার এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার ব্যবস্থা করে জনগণকে উন্নত জীবন দেওয়ার যাত্রা করেছে তাঁর সরকার।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত