দুর্গাপুজোর আর মাত্র ৩৫ দিন। তার আগেই উত্তর কলকাতার বাগবাজারে শুরু হয়ে গেল দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি। পুজো কমিটির নির্বাচন ঘিরে আইনি জট এখনও কাটেনি, আদালতে ঝুলছে মামলা। তার মধ্যেই প্রতিমার কাঠামো বাঁধার কাজ শুরু হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয়দের মনে। বাগবাজারের বাসিন্দাদের দাবি, আইনি সমস্যা থাকলেও ‘রানি মা’-এর পুজো এবার বন্ধ হবে না।
অন্য বছর এই সময়ের মধ্যে বাগবাজারের মাঠে প্যান্ডেলের কাজ অনেকটাই এগিয়ে যায়। প্রতিমার কাঠামোতেও পড়তে শুরু করে মাটির প্রথম প্রলেপ। কিন্তু এবার পুজো কমিটির নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া জটিলতায় সেই চেনা ব্যস্ততা দেখা যায়নি। ফলে ১০৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী পুজো আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে ভক্তদের মধ্যেও।
প্রথম দিকে বাগবাজারের পুজো বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে অবশ্য সেই জল্পনা অনেকটাই থামে। এবার আইনি জট পুরোপুরি না কাটলেও প্রতিমার কাঠামো বাঁধার কাজ শুরু হওয়ায় স্পষ্ট হচ্ছে, পুজোর প্রস্তুতি থামিয়ে রাখতে চাইছে না উদ্যোক্তাদের একাংশ।
থিমের পুজোর দাপটের মধ্যেও বাগবাজারের পুজোর আকর্ষণ অন্যরকম। শতাব্দীপ্রাচীন বনেদি ঐতিহ্য, রাজকীয় সাজ এবং সাবেকি রীতির জন্য এই পুজো কলকাতার দুর্গোৎসবের অন্যতম পরিচিত নাম। উত্তর কলকাতার ‘রানি মা’কে দেখতে প্রতি বছরই ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ।
এই ঐতিহ্যবাহী পুজোকে ঘিরেই এ বছর তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। মূল সমস্যা শুরু হয় পুজো কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। দুই গোষ্ঠীর টানাপোড়েনের জেরে বিষয়টি গড়ায় আদালত পর্যন্ত। কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে গত ৩০ অগস্ট দুই বিশেষ পর্যবেক্ষকের নজরদারিতে পুজো কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
মোট ৭৭ জন ভোটারের মধ্যে ৬৬ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। কিন্তু ফল প্রকাশের সময়ই তৈরি হয় নতুন জটিলতা। সম্পাদক পদের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীই পান ৩৩টি করে ভোট। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, দুই প্রার্থীই একই পরিবারের—ভাই গৌতম নিয়োগী এবং ভাস্কর নিয়োগী।
দুই ভাইয়ের ভোট সমান হওয়ায় সম্পাদক পদে কোনও প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা যায়নি। শুধু সম্পাদক পদেই নয়, ১২ জন কার্যকরী সদস্যের মধ্যে চারজন প্রার্থীও ৩২টি করে ভোট পান। ফলে সেখানেও তৈরি হয় সমতা। যদিও কোষাধ্যক্ষ পদে একজন প্রার্থী নির্বাচিত হন।
এরপরই পরিস্থিতি সামাল দিতে আদালত নিযুক্ত দুই বিশেষ পর্যবেক্ষক নিজেদের মধ্যে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু সভাপতির কাস্টিং ভোটের সম্ভাবনা ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। দুই ভাইয়ের একজন পর্যবেক্ষকদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন।
এরই মধ্যে ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে অশান্তির অভিযোগও সামনে আসে। এক মহিলা সদস্য ভোটকেন্দ্রে ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ করেন। ফলে পুজো কমিটির নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক আরও জটিল আকার নেয়।
বর্তমানে সেই মামলা আদালতে বিচারাধীন। এখনও চূড়ান্ত কোনও সমাধান হয়নি। ফলে পুজো কমিটির সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কিন্তু তার মধ্যেই প্রতিমার কাঠামো বাঁধার কাজ শুরু হওয়ায় বাগবাজারে ফিরছে পুজোর আবহ।
স্থানীয়দের কথায়, কমিটির অভ্যন্তরীণ সমস্যা যাই থাকুক, ১০৮ বছরের ঐতিহ্য থেমে থাকা উচিত নয়। পুজো হবেই—এই প্রত্যয় নিয়েই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। ফলে আদালতের জটের মধ্যে এবার বাগবাজারের ‘রানি মা’-এর পুজো কীভাবে সম্পন্ন হয়, এখন সেদিকেই নজর গোটা কলকাতার।



