ভারতের মাটিতে বসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ঐকমত্যের বার্তা দিল BRICS। ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের উপর নির্ভরতা কমানো, একতরফা শুল্কনীতির বিরোধিতা, রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কার এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপ—একাধিক বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেছে সদস্য দেশগুলি। ভারত, চিন ও রাশিয়া-সহ BRICS-এর এই যৌথ অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
ঘোষণাপত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি হল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ। BRICS-এর সদস্য দেশগুলির মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সদস্য দেশগুলির নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে আরও কার্যকর পেমেন্ট মেকানিজম গড়ে তোলার প্রস্তাবও রয়েছে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিকল্প আর্থিক পরিকাঠামো তৈরির বিষয়ে BRICS দেশগুলি যে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে, ঘোষণাপত্রে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। যদিও এটিকে ডলারকে সরাসরি সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, তবু দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন মুদ্রার আধিপত্য কমানোর আলোচনায় এই অবস্থান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রশ্নেও ঐকমত্যের বার্তা দিয়েছে BRICS। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রপুঞ্জের কাঠামোয় পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চিন ও রাশিয়াও ভারত ও ব্রাজিলের স্থায়ী সদস্যপদের দাবির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে বলে ঘোষণাপত্রে উল্লেখ রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দীর্ঘদিনের ভারতীয় দাবিও BRICS-এর যৌথ অবস্থানে আরও গুরুত্ব পেল।
বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রেও শক্ত বার্তা রয়েছে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে’। একতরফা শুল্ক এবং অশুল্কমূলক বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে BRICS। এই ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যকে ব্যাহত করছে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
উন্নয়নশীল অর্থনীতির স্বার্থে WTO-কে আরও কার্যকর করে তুলতে যৌথভাবে কাজ করার কথাও জানিয়েছে সদস্য দেশগুলি। ফলে বাণিজ্যনীতিতে একতরফা সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়ার বার্তাই সামনে এসেছে।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়েও অবস্থান স্পষ্ট করেছে BRICS। অসামরিক পরিকাঠামো এবং সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনার উপর হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখার গুরুত্বের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ক্ষেত্রে BRICS-এর সদস্য দেশগুলির অবস্থান সবসময় এক নয়। বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশগুলির উপস্থিতির কারণে এই ইস্যুতে ঐকমত্য তৈরি নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘোষণাপত্রে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে বিরোধের সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যাতে সংঘাতের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয় এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সেই প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ভারতের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ আর একটি বিষয়—পহেলগাম জঙ্গি হামলা। ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে’ পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। যে কোনও ধরনের সন্ত্রাসবাদকে কঠোরভাবে মোকাবিলার বার্তা দিয়ে সন্ত্রাসবাদে অর্থের জোগান বন্ধ, সীমান্তপারের জঙ্গি অনুপ্রবেশ রুখে দেওয়া এবং জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় বন্ধ করার বিষয়ে সম্মিলিত পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’ BRICS-এর ভিতরে ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। ডলারের উপর নির্ভরতা কমানো থেকে শুরু করে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার, একতরফা শুল্কনীতির বিরোধিতা, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান—একাধিক ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলি নিজেদের অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছে।
এই ঘোষণাপত্রকে সরাসরি আমেরিকাবিরোধী জোটের ঘোষণা বলা অবশ্যই অতিরঞ্জিত হবে। তবে ডলারনির্ভরতা কমানো এবং একতরফা শুল্কনীতির বিরোধিতার মতো অবস্থানগুলি ওয়াশিংটনের নীতির সঙ্গে যে সংঘাত তৈরি করতে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। ভারতের মাটিতে BRICS-এর এই সম্মিলিত বার্তা তাই আগামী দিনের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।



