একসময় বীরভূমের রাজনীতির সমার্থক ছিলেন তিনি। তাঁর বাড়ির সামনে ভিড় সামলাতে হিমশিম খেত পুলিশ, পার্টি অফিসে লেগে থাকত নেতা-কর্মীদের আনাগোনা। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই ছবিটাই যেন উল্টে গিয়েছে। ফাঁকা পার্টি অফিস, হাতে গোনা কয়েকজন অনুগামী আর নিঃসঙ্গ অনুব্রত মণ্ডল— বোলপুরে এখন এটাই নতুন বাস্তবতা।
বোলপুরের নিচুপট্টিতে অনুব্রত মণ্ডলের বাড়ির সামনে এখন আর আগের সেই ভিড় নেই। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীরাও বলছেন, একসময় যাঁদের সামলাতে ব্যস্ত থাকতে হতো, এখন সেখানে দিনের বেশিরভাগ সময়ই নির্জনতা। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও একই ছবি তুলে ধরছেন। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এলাকার পরিবেশও বদলে গিয়েছে।


সূত্রের খবর, নিয়মিত না হলেও মাঝে মধ্যে দলীয় কার্যালয়ে যাচ্ছেন অনুব্রত। সম্প্রতি এমনই এক দিনে তিনি পার্টি অফিসে পৌঁছনোর পর কয়েকজন কর্মী-সমর্থকের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে ফোনে বিভিন্ন সাংগঠনিক বিষয়ে খোঁজখবর নিতে দেখা যায় তাঁকে। কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা ছিল, ধৈর্য ধরে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে না জড়াতে।
ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, ভোট-পরবর্তী অশান্তি এবং বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে পড়া কর্মীদের আইনি সহায়তার বিষয়েও নজর রাখছেন তিনি। যদিও নিজেকে ঘিরে ওঠা বিতর্ক বা অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে এখনও অনীহা অনুব্রত।
দলের অভ্যন্তরেও ক্ষোভ ও হতাশার সুর স্পষ্ট। একাংশ নেতা-কর্মীর অভিযোগ, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাইরের পরামর্শের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলেই দলের ক্ষতি হয়েছে। কেউ কেউ আবার মনে করছেন, জেলার পুরনো নেতৃত্বকে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলও ভুগতে হয়েছে দলকে।


একসময় বীরভূমে অনুব্রত মণ্ডলের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। জেলা প্রশাসন থেকে দলীয় সংগঠন— সর্বত্র তাঁর প্রভাব নিয়ে আলোচনা হতো। বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্য এবং আগ্রাসী রাজনৈতিক ভাষণের জন্যও বারবার শিরোনামে এসেছেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে, আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানেও।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে বোলপুর পুরসভা এলাকা-সহ একাধিক জায়গায় বিরোধী দলের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট করেছে। এমনকি অনুব্রত মণ্ডলের নিজস্ব প্রভাববলয় হিসেবেও পরিচিত কিছু এলাকাতেও ফলাফল বদলে গিয়েছে।
এখন বোলপুরের রাজনৈতিক চিত্রে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে এক সময়ের ক্ষমতাকেন্দ্রের নিস্তব্ধতা। তবুও ঘনিষ্ঠদের কাছে অনুব্রত মণ্ডলের বার্তা একটাই— লড়াই এখনও শেষ হয়নি। তাঁর কথায়, তিনি এখনও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং দলের কর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করে চলেছেন।
রাজনৈতিক উত্থান-পতনের এই অধ্যায়ে বোলপুর যেন পশ্চিমবঙ্গের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতারই এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



