যোগব্যায়ামে কি সত্যিই ধূমপানের নেশা কমে? এইমসের গবেষণায় মিলল আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত, তবে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত

এইমসের নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, নিয়মিত যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম ও ধ্যান প্রচলিত চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত হলে তামাক ছাড়ার সাফল্যের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যতটা সহজ, সেই সিদ্ধান্ত ধরে রাখা ততটাই কঠিন। নিকোটিনের প্রতি নির্ভরতা, মানসিক অস্থিরতা, উদ্বেগ, বিরক্তি এবং বারবার তামাকের প্রতি আকর্ষণ—এই সব কারণেই অনেকেই কয়েক দিনের মধ্যে আবার পুরনো অভ্যাসে ফিরে যান। তবে ধূমপান ছাড়ার উপায় নিয়ে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা আশার আলো দেখাচ্ছে। দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS)-এর গবেষণায় উঠে এসেছে, নিয়মিত যোগব্যায়াম প্রচলিত চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত হলে তামাক ছাড়ার সাফল্যের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকা Nicotine & Tobacco Research-এ। এতে ভারত, আমেরিকা এবং থাইল্যান্ডে পরিচালিত সাতটি র‌্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়ালের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মোট ৬২৯ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকেরা মূল্যায়ন করেছেন, যোগব্যায়াম তামাক ত্যাগের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, যাঁরা নিকোটিন নির্ভরতা কমানোর প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত যোগব্যায়াম করেছেন, তাঁদের ধূমপান বা তামাক ছাড়তে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এর অর্থ এই নয় যে শুধু যোগব্যায়াম করলেই নেশা সম্পূর্ণ দূর হয়ে যাবে। বরং এটি চিকিৎসার সহায়ক বা পরিপূরক হিসেবে কাজ করে এবং সামগ্রিক সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়ায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক ছাড়ার সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিকোটিন প্রত্যাহারের (Nicotine Withdrawal) উপসর্গ। ঘনঘন ধূমপানের ইচ্ছা, অস্থিরতা, অকারণ রাগ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং ঘুমের সমস্যা অনেককেই মাঝপথে হাল ছাড়তে বাধ্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম এবং ধ্যান এই মানসিক চাপ কমাতে এবং মনকে স্থির রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অনেকেই নিয়মিত যোগচর্চার ফলে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার লক্ষণ কমেছে বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি তাঁদের আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এবং মানসিক স্থিতিশীলতাও বেড়েছে। গবেষকদের মতে, এই মানসিক পরিবর্তনই নিকোটিনের প্রতি আকর্ষণ সামলাতে সাহায্য করে এবং পুনরায় তামাকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে।

এই গবেষণায় হঠ যোগ (Hatha Yoga), ভিনিয়াসা যোগ (Vinyasa Yoga), আয়েঙ্গার যোগ (Iyengar Yoga), প্রাণায়াম এবং ধ্যানের মতো একাধিক যোগপদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে কোনও একটি নির্দিষ্ট যোগপদ্ধতিকে অন্যগুলির তুলনায় বেশি কার্যকর বলা হয়নি। গবেষকদের বক্তব্য, নিয়মিত ও ধারাবাহিক যোগচর্চাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তবে গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দিয়েছে। যোগব্যায়াম কোনও অলৌকিক সমাধান নয় এবং এটি তামাকের চিকিৎসার বিকল্পও হতে পারে না। নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (Nicotine Replacement Therapy), প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ, কাউন্সেলিং এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ এখনও তামাক ছাড়ার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত হয়। যোগব্যায়াম সেই চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করতে পারে।

এইমসের গবেষণা তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাই সামনে আনছে—ধূমপান বা তামাক ছাড়ার ক্ষেত্রে একক কোনও সমাধান নেই। চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সমন্বিত পদ্ধতিই দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট নিয়মিত যোগব্যায়াম শরীরের পাশাপাশি মনকেও আরও দৃঢ় করে তুলতে পারে, যা তামাকমুক্ত জীবন গড়ার পথে বড় সহায়ক হতে পারে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন