অভয়া কাণ্ডের দু’বছর পর ফের ১৪ আগস্ট রাতে মহিলাদের পথে নামার ডাক দিলেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul)। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে রাত ৯টায় বালিগঞ্জ শিক্ষাসদন থেকে গোলপার্ক পর্যন্ত মিছিলের ডাক দিয়েছেন তিনি। তাঁর আহ্বান, বয়সের কোনও সীমা না রেখে আট থেকে আশি—সব মহিলাই এই কর্মসূচিতে যোগ দিন। নারী নিরাপত্তা এবং মহিলাদের স্বাধীনতার দাবিকেই সামনে রেখে এই ‘রাত দখল’ কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বুধবার এই কর্মসূচির কথা ঘোষণা করে অগ্নিমিত্রা জানান, ১৪ আগস্ট রাত ৯টায় বালিগঞ্জ শিক্ষাসদন থেকে মিছিল শুরু হবে। গোলপার্ক পর্যন্ত যাওয়ার পর ফের শিক্ষাসদনের দিকে ফিরবে মিছিল। স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষ উদযাপনের প্রাক্কালে মহিলাদের রাতের রাস্তায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার বার্তা দিতেই এই কর্মসূচি বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
নারী নিরাপত্তা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অগ্নিমিত্রা আগের সরকারের আমলের একাধিক বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তাঁর অভিযোগ, মহিলাদের উপর কোনও অপরাধ ঘটলেই অনেক সময় তাঁদের পোশাক, বাইরে বেরনোর সময় কিংবা জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নতুন সরকারের আমলে এই ধরনের মানসিকতা আর বরদাস্ত করা হবে না বলেই দাবি করেন তিনি।
অগ্নিমিত্রার বক্তব্য, কোনও মহিলা কী পোশাক পরবেন, কখন বাড়ির বাইরে বেরোবেন বা রাতে কোথায় যাবেন—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর নিজের। নারী নিরাপত্তার নামে মহিলাদের স্বাধীনতার উপর নিয়ন্ত্রণ চাপানো উচিত নয়। সেই বার্তাই ১৪ আগস্টের মিছিলের মাধ্যমে তুলে ধরতে চান তিনি।
রাজ্যের নারী নিরাপত্তা নিয়ে আগের সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগও তুলেছেন পুরমন্ত্রী। তাঁর দাবি, তৃণমূল সরকারের সময়ে নারী নির্যাতনের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই মহিলাদেরই নানা ভাবে দায়ী করার প্রবণতা দেখা গিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে সেই মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।
এই কর্মসূচির সঙ্গে নারী আত্মরক্ষার বিষয়টিকেও যুক্ত করেছে রাজ্য সরকার। সরকারি স্কুলের ছাত্রীদের জন্য ‘রানি লক্ষ্মীবাঈ আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ’ চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অগ্নিমিত্রা। চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই স্কুলে স্কুলে এই প্রশিক্ষণ শুরু হওয়ার কথা।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে কী ভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে হবে, সে বিষয়ে ছাত্রীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের বক্তব্য, শুধুমাত্র পুলিশের উপর নির্ভর না করে মহিলাদের নিজেদের আত্মরক্ষার ক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন।
নারী নিরাপত্তার পরিকাঠামো নিয়েও সরকারের একাধিক উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। রাজ্যে মহিলা থানার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি মহিলাদের নিরাপত্তায় পুলিশের ‘দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড’ এবং অভিযোগ জানানোর জন্য হেল্পলাইন ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেছেন মন্ত্রী।
অগ্নিমিত্রার বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে মহিলাদের আত্মনির্ভরতার প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, নিরাপত্তা মানে শুধু পাহারা নয়, মহিলাদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং প্রয়োজনে নিজেদের রক্ষা করার সক্ষমতা তৈরি করাও জরুরি।
২০২৪ সালের আর জি কর-কাণ্ডের পর কলকাতা-সহ বাংলায় রাতের রাস্তায় মহিলাদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীন চলাফেরার অধিকার নিয়ে বড় সামাজিক আন্দোলন তৈরি হয়েছিল। সেই সময় ১৪ আগস্ট রাতে ‘রাত দখল’ কর্মসূচিতে বহু মহিলা পথে নেমেছিলেন। তার দু’বছর পর স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ফের একই ধরনের কর্মসূচির ডাক রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
এবার অগ্নিমিত্রার নেতৃত্বে ১৪ আগস্ট রাত ৯টার কর্মসূচিতে কত সংখ্যক মহিলা যোগ দেন, সেটাই দেখার। নারী নিরাপত্তা, স্বাধীন ভাবে চলাফেরার অধিকার এবং আত্মরক্ষার বার্তা সামনে রেখে এই মিছিলকে বড় আকার দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আয়োজকরা।



