জাতীয় কংগ্রেস ঘুরে দাঁড়াবার মুহূর্তেই কি রাহুল গান্ধী, সনিয়া গান্ধীর ‘হাত’ ছেড়ে নরেন্দ্র মোদির ‘পদ্ম’ শিবিরে যোদদান করতে চলেছেন প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী? কারণ, কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের সঙ্গে লাগাতার মতানৈক্য এবং বাংলায় বিরোধী রাজনীতির ধারক ও বাহক হিসাবে নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবার ক্ষেত্রে বিজেপি ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই বহরমপুরের টাইগারের। লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশে পরেই অধীরের বিজেপিতে যোগদান নিয়ে একটা আভাস মিলেছিল। মনে করা হচ্ছে, তা সম্ভব হবে আগামী কয়েকমাসের মধ্যেই।
সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছে অধীরকে। ডবল হ্যাটট্রিক করার সাধ পূরণ হয়নি। রাজনীতিতে ‘আনকোরা’ সুদূর গুজরাতের বাসিন্দা ভারতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার তৃণমূল প্রার্থী ইউসুফ পাঠানের কাছে হেরে গিয়েছেন। তাঁর ভোট কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। কিন্তু, অধীরের মতো আনখশির একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পক্ষে এই হার মেনে নেওয়া সহজ ছিল না।
হারের পরেই দুঃখের সঙ্গে জানিয়েছিলেন, এবার কী করব জানি না, হয়তো বাদাম বেচব! বলেছিলেন, রাজ্যে তৃণমূলের বিরোধিতা করতে করতে ব্যবসাও ‘লাটে’ উঠেছে। হারের কারণ হিসাবে অধীর নিজে যেটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তা হল, তৃণমূল ও বিজেপির তৈরি করা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বাইনারীর বিরুদ্ধে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি নাকি ‘ধোপে’ টেকেনি। পাশাপাশি, ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি অভিযোগ করেন, জাতীয় কংগ্রেসের তরফে নাকি ভোটের পর প্রচারের টাকা হাতে পান তিনি।

এর পরেই প্রশ্ন ছিল, অধীর তাহলে এখন কী করবেন? কারণ, এ রাজ্যে তিনি তৃণমূল বিরোধী। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘খুল্লামখুল্লা’ সমালোচনা তিনি করে থাকেন। কিন্তু, সেখানে হাইকম্যান্ডের থেকে যে পরিমাণ সহযোগিতা প্রয়োজন তা মেলে না। কারণ, কংগ্রেস, তৃণমূল সকলেই ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অংশ। আর রাহুল, সনিয়াদের মমতার প্রতি যে ‘নরমপন্থী’ মনোভাব তাতে অধীরের পক্ষে রাজ্যে কংগ্রেসকে টিকিয়ে রাখজাই মুশকিল।
এমতাবস্থায়, অধীরের মূল লক্ষ্য, মমতার বিরোধিতা, প্রকারন্তরে তৃণমূলের বিরোধিতা। যেটা কংগ্রেস দলে থেকে সম্ভব হচ্ছে না। আর সেখানেই অসমর্থিত সূত্রে খবর, বিজেপিতে নাম লেখাতে পারেন অধীর চৌধুরী। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও এ বিষয়ে বলেছেন। ফলে, এটা কেবল জল্পনা নয়, এই সম্ভাবনার একটা বাস্তবতা রয়েছে।
অন্যদিকে, রাজ্যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে যত না সরব হয়েছেন অধীর, তার ১০ শতাংশও নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি বিরোধীতা শোনা যায়নি তাঁর মুখে। নির্বাচন চলাকালীন একটি জনসভায় যখন মমতা বন্দোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, তৃণমূল ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে সমর্থন করবে, কিন্তু রাজ্যে অধীরের কারণে জোট হল না, তখন কংগ্রেস হাইকমান্ড সরাসরি ধমক দেয় অধীরকে। জানিয়ে দেওয়া হয়, পার্টি লাইন না মানলে বেরিয়ে যেতে হবে!
সেই সময় ব্যাকফুটে থাকা অধীরকে কার্যত টোপ দেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। সরাসরি প্রস্তাব দেন, বিভীষণের বাড়ি (কংগ্রেস) ছেড়ে রামের(বিজেপি) বাড়িতে আসার। এখন অধীর পরাজিত, ভোট বিন্যাস দেখলে বোঝা যাবে, তিনি পরাজিত বিজেপির কারনেই। কিন্তু তবুও তাঁর জন্যে দরজা ভালোভাবে খুলে রেখেছে বিজেপি। সুকান্ত মজুমদার তাঁর হেরে যাওয়াতে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, অধীর ‘দা’ সম্বোধন করে।
বিজেপির পথে অধীর! নজরবন্দির খবরে সিলমোহর সময়ের অপেক্ষা

এরই মধ্যে হাইকম্যান্ডের সঙ্গে ফের বিরোধ বেঁধেছে অধীরের। তিনি সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, “আমাদের লোকদের মারছে, যে কর্মীরা রাতদিন তৃণমূলের হাতে মার খেলো, খাচ্ছে, তাদের জন্য আমরা বলবো না তো কে বলবে? শাসক তৃণমূল আমাদের দল ভাঙছে প্রতিদিন! ওরা তো ‘ইন্ডিয়া’ জোটে সামিল হয়ে আমাদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করেনি! তৃণমূল তো এ রাজ্যের শাসক দল, তারা কি আমাদের কংগ্রেস কর্মীদের কোনোরকম রেহাই দিয়েছে? আজও জেলে বন্দি আমাদের কর্মী, মিথ্যা মামলায় জর্জরিত,আমাদের পার্টি অফিস দখল করেছে, করছে, বিরাম নেই তো!”
সঙ্গে তিনি আরও লিখেছেন, “তাহলে সেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে কীকরে চুপ করব, করলে আমার সেই সহকর্মীদের প্রতি অবিচার অন্যায় করা হবে! আমি পারব না। যে কর্মীরা রাতদিন লড়াই করছে, দলের পতাকা নিয়ে রাস্তায় আন্দোলন করছে তাদের সাথেও দিল্লি কথা বলুক, তাদের মতামতও জানা দরকার। তাদেরকেও দিল্লিতে ডাকা দরকার। আমি আমার সেই সকল সহকর্মীদের সাথে রাস্তায় থাকব, আন্দোলনের পথে, অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে শিখিনি, করবোও না।”



