দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে বড়সড় নড়াচড়া। ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনার চুক্তি থেকে সরে গেল আবুধাবি—যা পাকিস্তানের জন্য নিঃসন্দেহে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তের সময়টাই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এর ঠিক আগেই সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ঝটিকা সফরে ভারতে এসে একাধিক কৌশলগত চুক্তি সেরে গিয়েছেন। তার পরপরই ইসলামাবাদ সংক্রান্ত প্রকল্পে আগ্রহ হারাল আবুধাবি।
সূত্রের খবর, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিচালনা নিয়ে পাকিস্তান ও আবুধাবির মধ্যে আলোচনা চলছিল। পরিকল্পনা ছিল—একটি পাকিস্তানি সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিমানবন্দর পরিচালনা করবে আবুধাবি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রকল্প থেকে কার্যত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তারা। এমনকী এখনও পর্যন্ত কোনও পাকিস্তানি অংশীদারও চূড়ান্ত করা হয়নি।


সৌদি–আমিরশাহী টানাপোড়েন, চাপে পাকিস্তান
এই সিদ্ধান্তের পিছনে শুধু দ্বিপাক্ষিক কারণ নয়, রয়েছে বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়ার সমীকরণ। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। দুই প্রভাবশালী মুসলিম দেশের এই অস্বস্তিকর সম্পর্কের মাঝখানে পড়ে কার্যত দিশাহারা পাকিস্তান। কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে ইসলামাবাদ যে ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে, বিমানবন্দর চুক্তি থেকে আবুধাবির সরে যাওয়া তারই ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ঝটিকা ভারত সফর ও কৌশলগত বার্তা
উল্লেখযোগ্য ভাবে, গত ১৯ জানুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ঝটিকা সফরে ভারতে আসেন। এই সফরে পরমাণু শক্তি, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, খাদ্য সুরক্ষা ও বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে একাধিক চুক্তিতে সই হয় ভারত ও ইউএই-এর মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেন। একই গাড়িতে দুই রাষ্ট্রনেতার সফরের ছবি প্রকাশ্যে আসতেই তা কূটনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য পায়।
সফরটি সংক্ষিপ্ত হলেও, ভারত–ইউএই সম্পর্ক যে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, সে বার্তা স্পষ্ট ছিল। আর সেই সফরের পরপরই ইসলামাবাদ বিমানবন্দর প্রকল্প থেকে আবুধাবির সরে যাওয়া—এই দুই ঘটনাকে আলাদা করে দেখছেন না আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।


ফৌজি ফাউন্ডেশন চুক্তি নিয়েও প্রশ্ন
এ দিকে, সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরশাহী পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তার ইঙ্গিত দিয়েছিল। জানা গিয়েছে, পাকিস্তানের সেনা-পরিচালিত কর্পোরেট সংস্থা Fauji Foundation-এর শেয়ারের বিনিময়ে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইউএই। এই ফৌজি ফাউন্ডেশন পাকিস্তানি সেনার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, যা খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যকলাপে যুক্ত।
কিন্তু সৌদি–আমিরশাহী সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ইসলামাবাদ বিমানবন্দর প্রকল্প থেকে সরে যাওয়ার পর, সেই বিনিয়োগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে—তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে, আবুধাবির এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি চুক্তি বাতিল নয়। এটি পাকিস্তানের ক্রমশ সঙ্কুচিত কূটনৈতিক পরিসর এবং ভারতের সঙ্গে ইউএই-এর ঘনিষ্ঠতার স্পষ্ট ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।







