সিঙ্গুর আন্দোলনের মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিছনে নীরবে বসে থাকা যুবকটি একদিন তৃণমূলের ‘নম্বর টু’ হয়ে উঠবেন, তা তখন কেউ ভাবেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান শুধু দলের ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল তৃণমূলের সাংগঠনিক চরিত্রও। আর ২০২৬-এর ভরাডুবির পর এখন দলের অন্দরেই উঠছে প্রশ্ন— অভিষেকের তৈরি ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ই কি শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের ভিত দুর্বল করে দিল?
২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অভিষেকের রাজনৈতিক যাত্রা দ্রুত গতি পেতে শুরু করে। যুব তৃণমূল থাকা সত্ত্বেও তাঁর জন্য আলাদা ‘যুবা’ সংগঠন তৈরির অনুমতি দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক মহলের মতে, সেখান থেকেই ভবিষ্যতের ক্ষমতার রূপরেখা স্পষ্ট হতে শুরু করে।


২০১৪ সালে ডায়মন্ড হারবার থেকে প্রথমবার সাংসদ হন অভিষেক। সেই কেন্দ্র তখন তৃণমূলের সবচেয়ে নিরাপদ আসনগুলির মধ্যে একটি। কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছরে শুধু জেতাই নয়, গোটা এলাকাকে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসেন তিনি। ধীরে ধীরে শুভেন্দু অধিকারী, সৌমিত্র খাঁদের পর যুব সংগঠনের দায়িত্বও তাঁর হাতে আসে।
দলের পুরনো নেতৃত্বকে সরিয়ে নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার প্রক্রিয়াও শুরু হয় সেই সময় থেকেই। মুকুল রায়, শোভন চট্টোপাধ্যায় কিংবা ফিরহাদ হাকিমদের মতো নেতাদের গুরুত্ব কমতে থাকে। কালীঘাটের বদলে ক্যামাক স্ট্রিট হয়ে ওঠে তৃণমূলের নতুন পাওয়ার সেন্টার— এমন কথাও শোনা যেতে থাকে রাজনৈতিক অন্দরে।

অভিষেকের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গেই তৃণমূলে প্রবেশ করে আই-প্যাক। প্রশান্ত কিশোরের টিমের হাত ধরে ‘দুয়ারে সরকার’, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘নবজোয়ার’-এর মতো কর্মসূচি বিপুল প্রচার পায়। ২০২১ সালের ভোটে সেই কৌশল সফলও হয়। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরে তৃণমূল।


কিন্তু সাফল্যের পরই দলের ভিতরে অস্বস্তি বাড়তে থাকে। অভিযোগ ওঠে, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ কর্মীদের হাতছাড়া হয়ে পেশাদারি টিম ও ঘনিষ্ঠ মহলের হাতে চলে যাচ্ছে। স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। দলের একাংশের মতে, “দল আবেগে চলে, ডেটায় নয়।”
অভিষেককে ঘিরে তৈরি হয় এক আলাদা রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ‘এক ডাকে অভিষেক’, ‘দাদার অনুগামী’, ‘অভিষেকের সেনা’— এই সব স্লোগান ও সংগঠন তৃণমূলের পুরনো কর্মীদের অনেকের কাছেই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে তাঁর নিরাপত্তা, ভিভিআইপি কনভয়, জেলায় জেলায় অনুগামীদের বাড়বাড়ন্ত নিয়েও দলের ভিতরে ক্ষোভ তৈরি হয়।
সমালোচকদের মতে, অভিষেক শুধু দলের নয়, সরকারের সমান্তরাল কাঠামোও তৈরি করতে চেয়েছিলেন। ‘সেবাশ্রয়’ থেকে শুরু করে ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’— সবকিছুতেই আলাদা ব্র্যান্ড গড়ে তোলার চেষ্টা ছিল স্পষ্ট। যদিও সমর্থকদের দাবি, এর ফলে সাধারণ মানুষ সরাসরি পরিষেবা পেয়েছেন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের বিপর্যয়ের পর সেই সমস্ত প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। দলের একাংশের দাবি, দীর্ঘদিনের সংগঠক ও মাঠে-ময়দানে লড়াই করা কর্মীদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার ফলেই দলের ভিত দুর্বল হয়েছে। আই-প্যাকের রিপোর্টের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং পুরনো নেতাদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও অনেকের মতে বড় ভুল ছিল।
এখন রাজনৈতিক মহলের বড় প্রশ্ন— ক্ষমতার বাইরে এসে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি কোন পথে যাবে? তিনি কি সত্যিই মাঠের কর্মীদের ‘সেনাপতি’ হয়ে উঠতে পারবেন, নাকি কর্পোরেট-রাজনীতির ছাপ তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও কঠিন করে তুলবে? তৃণমূলের আগামী অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে আপাতত এই প্রশ্নই ঘুরছে।







