শ্রীনগরের উপকণ্ঠে পুলিশের হাতে গ্রেফতার ৮০ বছরের এক ব্যক্তি। পুলিশের অভিযোগ, বছরের পর বছর কখনও সোমনাথ কৌল (Somnath Koul), কখনও ব্রিজনাথ ভাট, মোহনলাল ধর বা হাদিনাথ ধর—এমন একাধিক পরিচয় ব্যবহার করে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ফেলে যাওয়া জমি বিক্রির নামে প্রতারণা করতেন তিনি। পুলিশের দেওয়া এই পরিচয়গুলির কারণেই তদন্তকারীদের কাছে তাঁর নাম হয়ে যায় ‘কাশ্মীরের চার্লস শোভরাজ’।
ঘটনাটি শ্রীনগরের জেওয়ান এলাকার। ২৪ সেপ্টেম্বর সেখানে একটি বাড়িতে পুলিশ হানা দিলে প্রথমে জানানো হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি বাড়িতে নেই। কিন্তু ঘরে ঢোকার পর পুলিশের নজরে আসে এক বৃদ্ধ, যিনি আলো-আঁধারি ঘরে বসে উর্দু সংবাদপত্র পড়ছিলেন। সেখান থেকেই খুলতে শুরু করে দীর্ঘদিন ধরে পালিয়ে থাকা এক অভিযুক্তের পরিচয় ও প্রতারণার জট।
পুলিশের অভিযোগ, প্রায় এক দশক ধরে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে জমি বিক্রির প্রস্তাব দিতেন কৌল। কখনও নিজেকে জমির মালিক, কখনও আসল মালিকের ‘অ্যাটর্নি’ বা প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিতেন তিনি। অভিযোগ, ভুয়ো নথির মাধ্যমে চুক্তি করে টাকা নেওয়ার পর গা-ঢাকা দিতেন।
এই মামলার তদন্ত শুরু হয় জমির একটি চুক্তিপত্রে কৌলের ছবি পুলিশের হাতে আসার পর। গত জানুয়ারিতে সেই সূত্র পাওয়ার পরে প্রায় ন’মাস ধরে তাঁর খোঁজ চালায় ক্রাইম ব্রাঞ্চ। তদন্তে ২০১৭ সাল থেকে জমি সংক্রান্ত প্রতারণার একাধিক অভিযোগের সন্ধান মেলে।
তদন্তকারীদের মতে, তাঁর বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ইকনমিক অফেন্সেস উইং (EOW) এবং স্পেশাল ক্রাইম উইংয়ে নথিভুক্ত মামলাগুলিতে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং কাশ্মীরি অভিবাসীদের সম্পত্তি ভুয়ো নথিতে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। কৌল দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশের চোখ এড়িয়ে ছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি।
তাঁর একাধিক পরিচয়ও তদন্তকারীদের চমকে দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক কৌলের সার্ভিস রেকর্ডে নাম রয়েছে ব্রিজনাথ ভাট। আবার তদন্তে তাঁর নামে দুটি ভোটার কার্ড এবং দুটি আধার কার্ডের সন্ধান পাওয়া যায়—যেখানে চারটি আলাদা নাম রয়েছে বলে পুলিশের দাবি।
শুধু নাম বদলেই থেমে থাকেননি বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের দাবি, তাঁর আঙুলের ডগা ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, ফলে বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পুলিশকে তিনি জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনায় তাঁর আঙুল পুড়ে গিয়েছিল। এই দাবি নিয়েও তদন্ত চলছে।
তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে খুঁজে পাওয়ার সূত্রটি ছিল আরও অদ্ভুত। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, কৌল নিয়মিত সংবাদপত্র পড়তেন এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি সংবাদপত্রের গ্রাহক ছিলেন। সেই সূত্র ধরে তাঁর পড়া সংবাদপত্রের সাবস্ক্রিপশন ট্র্যাক করতে শুরু করেন তদন্তকারীরা। শেষ পর্যন্ত সেই পথই পুলিশকে জেওয়ানের একটি বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
তদন্তে উঠে এসেছে একাধিক জমি লেনদেনের অভিযোগও। একটি মামলায় এক ব্যক্তি দাবি করেন, পুলওয়ামার দ্রুসু এলাকায় পাঁচ কানাল জমি এবং বিজবেহারায় পপলার গাছ-সহ একটি জমির জন্য মোট ৯৩ লক্ষ টাকা দিয়ে তিনি প্রতারিত হয়েছেন। পরে আদালতে চুক্তিটি বৈধ করার চেষ্টা করলে জানতে পারেন, বিক্রেতা হিসেবে যাঁর নাম দেওয়া হয়েছিল, জমিটি আদৌ তাঁর নয়।
অন্য একটি মামলায় পুলিশের দাবি, শ্রীনগরের গুলাব বাগ পান্দাচ এলাকায় জমি বিক্রির নামে ৪৭ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছিল। আবার হুমহামা এলাকায় একই জমি দু’জন ক্রেতার কাছে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। দুই ক্রেতার কাছ থেকে মিলিয়ে প্রায় এক কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছে পুলিশ।
কাশ্মীরের ইকনমিক অফেন্সেস উইংয়ের সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ আবদুল ওয়াহিদ শাহ জানিয়েছেন, জমি কেনার ক্ষেত্রে সাধারণ পরিবারগুলি তাদের সঞ্চয়ের বড় অংশ ব্যয় করে। সেই অর্থ প্রতারণার মাধ্যমে হাতছাড়া হলে পরিবারের উপর তার গুরুতর প্রভাব পড়ে। মামলাগুলিতে জড়িত দালাল বা অন্য কারও ভূমিকা থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সোমনাথ কৌল বর্তমানে শ্রীনগর সেন্ট্রাল জেলে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলির তদন্ত এখনও চলছে। ফলে জমি প্রতারণার পুরো চক্রে আর কারা জড়িত এবং আর কতগুলি লেনদেনের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।



