ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে বড় পরিবর্তন। সব ফরম্যাটে ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেন হরমনপ্রীত কউর। মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগঘন বার্তায় নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, বিশ্বকাপ জয়ের পর এবং সদ্য এশিয়ান গেমসে ভারতকে সোনা এনে দেওয়ার পরই নেতৃত্ব ছাড়লেন দীর্ঘদিনের এই অধিনায়ক।
হরমনপ্রীতের এই সিদ্ধান্তে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হল। ২০২২ সালে মিতালি রাজের অবসরের পর ওয়ানডেতে পূর্ণ সময়ের অধিনায়কত্ব পান হরমনপ্রীত। পরের বছর তিন ফরম্যাটেই দলের নেতৃত্ব তাঁর হাতে আসে। ২০১৬ সাল থেকেই টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।
আবেগঘন বার্তায় কী বললেন হরমনপ্রীত?
ইনস্টাগ্রামে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে হরমনপ্রীত স্পষ্ট করেছেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর কাছে সহজ ছিল না। দীর্ঘদিনের স্মৃতি, আবেগ, আত্মত্যাগ এবং দলের জন্য নিজের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দেওয়ার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—অধিনায়ক হিসেবে দলের স্বার্থকেই সবসময় ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের আগে রেখেছেন। এমন অনেক সিদ্ধান্ত তাঁকে নিতে হয়েছে, যা সকলের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়নি। কিন্তু তাঁর দাবি, প্রতিটি সিদ্ধান্তের পিছনে একটাই লক্ষ্য ছিল—ভারতীয় দলকে আরও শক্তিশালী করা এবং সতীর্থদের নিজেদের সেরাটা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
বিদায়বার্তায় নিজের অধিনায়কত্বের সময়কার ব্যর্থতা, সমালোচনা, হতাশা যেমন স্মরণ করেছেন, তেমনই সাফল্য, জয় এবং দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার গর্বের কথাও বলেছেন হরমনপ্রীত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এসেছে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে। অধিনায়কত্ব ছাড়লেও ক্রিকেট থেকে সরে যাচ্ছেন না তিনি। বরং নিজের বক্তব্যে জানিয়েছেন, এবার ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা নিয়েই খেলায় মন দিতে চান। অর্থাৎ নেতৃত্বের অধ্যায় শেষ হলেও হরমনপ্রীতের ক্রিকেটযাত্রা এখানেই থামছে না।
হরমনপ্রীতের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে গত বছর। তাঁর অধিনায়কত্বেই ভারত প্রথমবার মহিলা ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতে। ফলে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর নাম স্থায়ী হয়ে যায়। ICC-ও তাঁকে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর পদত্যাগের খবর নিশ্চিত করেছে।
বিশ্বকাপ জয়ের পরও নেতৃত্বের দায়িত্ব সামলে যাচ্ছিলেন হরমনপ্রীত। এর মধ্যেই ২০২৬ এশিয়ান গেমসে ভারতীয় মহিলা দল টি-টোয়েন্টিতে সোনা জেতে। অর্থাৎ নেতৃত্বের শেষ পর্বেও তাঁর ঝুলিতে যোগ হয়েছে আরও একটি বড় আন্তর্জাতিক সাফল্য।
টি-টোয়েন্টিতে হরমনপ্রীতের নেতৃত্বের সময়কাল ছিল দীর্ঘ। ২০১৬ সালে তিনি এই ফরম্যাটে ভারতের অধিনায়ক হন। ২০২২ সালে ওয়ানডে নেতৃত্বের পূর্ণ দায়িত্ব পান এবং ২০২৩ সাল থেকে তিন ফরম্যাটেই ভারতের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এমনকি চলতি বছরই টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হিসেবে একটি বিশেষ রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। সেপ্টেম্বরের শুরুতে হরমনপ্রীত বিশ্বের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ১৫০টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে কোনও দলের অধিনায়কত্ব করার নজির গড়েন।
তাঁর নেতৃত্বের সময়ে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট একাধিক বড় মঞ্চে সাফল্য পেয়েছে। এবার সেই দায়িত্ব অন্য কারও হাতে যাওয়ার পালা।
হরমনপ্রীতের বিদায়বার্তায় একটি বিষয় স্পষ্ট—এটি ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা নয়। অধিনায়কত্বের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে তিনি এবার নিজের খেলায় আরও মনোনিবেশ করতে চান। তাঁর কথায়, নেতৃত্ব শেষ হলেও ভারতের ক্রিকেটের প্রতি তাঁর ভালোবাসা একই থাকবে।
সোমবার গুয়াহাটিতে BCCI-এর একটি রিভিউ বৈঠকের পরই তাঁর এই সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। বৈঠকে হরমনপ্রীতের পাশাপাশি সহ-অধিনায়ক স্মৃতি মন্ধানা এবং কোচ অমল মজুমদারও উপস্থিত ছিলেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে হরমনপ্রীতের নিজের বার্তায় অধিনায়কত্ব ছাড়ার নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে কোনও একটি বিষয়কে আলাদা করে তুলে ধরা হয়নি।
তাই আপাতত নিশ্চিত খবর একটাই—ভারতীয় মহিলা দলের দীর্ঘদিনের অধিনায়ক হরমনপ্রীত কউর আর নেতৃত্বে থাকছেন না। বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব ছাড়ার সময় তাঁর নিজের কথাতেই রয়েছে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত: ক্যাপ্টেনসি শেষ, কিন্তু ক্রিকেটের যাত্রা এখনও বাকি।



