জ্ঞানেশ কুমারের পর এ বার নির্বাচন কমিশনের আইটি বিভাগের শীর্ষ আধিকারিক সীমা খন্নার বিরুদ্ধে থানায় গেলেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। বুধবার দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় নির্বাচন কমিশনের IT বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্নার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন কৃষ্ণনগরের সাংসদ। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকা পরিচালনার সফ্টওয়্যার, SIR প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের নির্বাচনী আধিকারিকদের ভূমিকা।
এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর একই থানায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেছিলেন মহুয়া। এ বার সেই অভিযোগের পরিসর আরও বাড়িয়ে কমিশনের আইটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সীমা খন্নাকেও অভিযোগের আওতায় আনলেন তিনি। মহুয়ার বক্তব্য, সীমার বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর করা হবে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক তাঁকে বিষয়টি পর্যালোচনা করে জানানোর কথা বলেছেন।
মহুয়ার অভিযোগের পটভূমিতে রয়েছে ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত The Indian Express-এর একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদন। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই রিপোর্টে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে ভোটার তালিকা তৈরির পদ্ধতি এবং সফ্টওয়্যার ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু ও বিবেক জোশীর আপত্তির কথা সামনে আসে। তাঁদের আপত্তির একটি অংশ ছিল ভোটার তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া আগের তুলনায় কতটা কেন্দ্রীভূত হয়েছে, তা নিয়ে।
প্রসঙ্গটি মূলত ‘ERONet’ এবং ‘ECINet’ সফ্টওয়্যার ব্যবস্থা ঘিরে। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগে ভোটার তালিকার কাজ ‘ERONet’-এ পরিচালিত হত, বর্তমানে তা ‘ECINet’-এ রয়েছে। ভোটার তালিকায় নাম যোগ করা বা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ERO-দের ক্ষমতা কমেছে কি না, সেই প্রশ্ন নিয়েও দুই নির্বাচন কমিশনার আপত্তি তুলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু এর আগে ERO-দের সফ্টওয়্যারে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে আনন্দবাজার জানিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পোর্টালের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে সীমা খন্নার ভূমিকা নিয়ে আপত্তি রয়েছে। তবে এগুলি কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতামত ও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বক্তব্য; সীমা খন্নার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি এখনও প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
মহুয়ার অভিযোগপত্রে গোয়ার ভোটার তালিকা সংশোধনের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর গোয়ার ERO-রা ৯৭ জনকে যোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত সফ্টওয়্যারে নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা ছিল না বলে অভিযোগ ওঠে। গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর থেকে সফ্টওয়্যারে ‘rollback’ অপশন চালু করার জন্য একাধিক বার চিঠি পাঠানো হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই প্রক্রিয়ায় ৯৭ জন যোগ্য ব্যক্তির নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ফেরানোর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। এই ঘটনাকেই সীমা খন্নার বিরুদ্ধে নিজের অভিযোগের অন্যতম ভিত্তি করেছেন মহুয়া। তাঁর দাবি, ভোটার তালিকার সফ্টওয়্যার ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের ফলে স্থানীয় নির্বাচনী আধিকারিকদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এর সঙ্গে জুড়েছে Form 6-এর পরিবর্তন এবং SIR নিয়ে বিতর্ক। এর আগে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার সময় মহুয়া দাবি করেছিলেন, নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার Form 6-এ এমন একটি প্রশ্ন যোগ করা হয়েছিল, যার সঙ্গে আগের SIR-এর তথ্য বা পারিবারিক যোগসূত্রের বিষয় জড়িত। এই পরিবর্তন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের আপত্তির কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল।
মহুয়ার অভিযোগ, ভোটার তালিকা পরিচালনার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের ERO এবং BLO-দের পর্যাপ্ত ভূমিকা না রেখে সফ্টওয়্যার-নির্ভর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সীমা খন্নার বিরুদ্ধে তাঁর নতুন অভিযোগও মূলত এই সফ্টওয়্যার ব্যবস্থাপনা এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই।
তবে এখানে নির্বাচন কমিশনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ নোট, পর্যবেক্ষণ বা কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য প্রাতিষ্ঠানিক কাজের স্বাভাবিক অংশ। একই সঙ্গে কমিশনের বক্তব্য, প্রকাশিত সিদ্ধান্তগুলির আইনগত বৈধতা রয়েছে এবং SIR সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলি কমিশনের পক্ষ থেকে সর্বসম্মত ভাবেই নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, মহুয়ার অভিযোগ এবং কমিশনের বক্তব্য—দুইয়ের মধ্যে মূল বিতর্কটা দাঁড়াচ্ছে নির্বাচন কমিশনের সফ্টওয়্যার ব্যবস্থাপনা কতটা কেন্দ্রীয় ছিল, ERO-দের হাতে কতটা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং SIR চলাকালীন ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কী প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নে।
এই বিতর্কের মধ্যেই মহুয়া মৈত্রের পদক্ষেপের রাজনৈতিক ও আইনি গুরুত্ব বেড়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার এক সপ্তাহের মধ্যেই এ বার কমিশনের আইটি বিভাগের শীর্ষ আধিকারিকের বিরুদ্ধে থানায় গেলেন তিনি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও সীমা খন্নার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা হয়নি।
মহুয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অভিযোগ থেকে এফআইআর, তদন্ত এবং তার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ—প্রতিটি ধাপেই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া প্রয়োজন হবে। এই মুহূর্তে সীমা খন্নার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত অপরাধ হিসেবে নয়।
এক নজরে:
- সীমা খন্নার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন মহুয়া মৈত্র।
- অভিযোগ দায়ের হয়েছে দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায়।
- ভোটার তালিকার সফ্টওয়্যার এবং SIR প্রক্রিয়া অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্র।
- ERO-দের সফ্টওয়্যার অ্যাক্সেস ও ক্ষমতা নিয়ে কমিশনের অন্দরে প্রশ্ন ওঠার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।
- নির্বাচন কমিশন অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ বলে জানিয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলির বৈধতার কথা বলেছে।



