তেলের দাম ১০৮ ডলার পেরোতেই আতঙ্ক! বড় বিপদের মুখে বিশ্ব অর্থনীতি? কী হবে দেশের অবস্থা

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের আঁচ পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্য পথে। তেলের দাম ১০৮ ডলার ছাড়ানোয় মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার ও বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

হরমুজ প্রণালীর পর এ বার বাব এল-মান্দেব। পশ্চিম এশিয়ার চলতি সংঘাতের প্রভাব পড়ছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্য পথগুলিতেও। ফলে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। এর জেরে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে বলে দেওয়া তথ্যের দাবি। আর তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি থেকেই ফের জোরালো হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা।

বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে জ্বালানি তেলের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কলকারখানায় উৎপাদন থেকে শুরু করে যাত্রী পরিবহণ, পণ্য পরিবহণ এবং কৃষি—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জ্বালানির প্রয়োজন হয়। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পেট্রল-ডিজ়েলের বাজারে আটকে থাকে না, ছড়িয়ে পড়ে গোটা অর্থনীতিতে।

তেলের দাম বাড়লে প্রথম ধাক্কা আসে পরিবহণ খরচে। পণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ব্যয় বাড়ে। উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির খরচও বেড়ে যায়। সেই অতিরিক্ত খরচ অনেক সময় পণ্যের দামে চাপানো হয়। ফলে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার খরচ বাড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হয়।

ইতিহাসেও একাধিক বার দেখা গিয়েছে, বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে তেলের বাজারে অস্থিরতার সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭৩ সালে মিশর ও সিরিয়ার সঙ্গে ইজ়রায়েলের যুদ্ধের সময় আরব দেশগুলির তেল সরবরাহ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধাক্কা দেয়। অল্প সময়ের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে আমেরিকা-সহ একাধিক উন্নত দেশের অর্থনীতিতে।

এর ছ’বছর পর, ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামীয় বিপ্লবের ফলে দেশটির তেল উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগে। বিশ্ববাজারে ফের তেলের দাম বাড়তে শুরু করে। মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে আমেরিকার মতো দেশকেও অত্যন্ত কঠোর আর্থিক নীতি নিতে হয়েছিল। উচ্চ সুদের হার অর্থনীতির উপর আরও চাপ তৈরি করেছিল।

১৯৯০ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন কুয়েত আক্রমণ করলে তেলের বাজারে ফের অস্থিরতা দেখা দেয়। বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্রুত বেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বাহিনী ‘অপারেশন ডেজ়ার্ট স্টর্ম’-এর মাধ্যমে ইরাকি বাহিনীকে কুয়েত থেকে সরিয়ে দেয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তেলের বাজারে কিছুটা স্থিতি ফিরলেও বিশ্ব অর্থনীতিতে তার অভিঘাত থেকে যায়।

ভারতের ক্ষেত্রেও উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রভাব ছিল গভীর। বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডার বা IMF-এর কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি দেশের সোনা বিদেশি ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রাখার মতো পদক্ষেপও করতে হয়েছিল তৎকালীন সরকারকে।

২০০৮ সালেও অপরিশোধিত তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। এক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম প্রায় ১৪৭ ডলারে উঠে যায়। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে আর্থিক অস্থিরতা বাড়ছিল। ফলে তেলের মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।

এ বার পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি বাব এল-মান্দেব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এই দুই সমুদ্রপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহণে এগুলির ভূমিকা বড়। ফলে এই পথগুলিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

তেলের দাম ১০৮ ডলারের আশপাশে পৌঁছনোয় স্বাভাবিক ভাবেই আর্থিক বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। কারণ, তেলের দাম শুধু মুদ্রাস্ফীতি বাড়ায় না, উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির মুনাফার উপরও চাপ তৈরি করে। সংস্থার সামনে তখন সাধারণত দু’টি পথ থাকে—উৎপাদন খরচের চাপ সামলাতে পণ্যের দাম বাড়ানো অথবা মুনাফার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া।

প্রথম ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের উপর মূল্যবৃদ্ধির বোঝা বাড়ে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সংস্থার মুনাফা কমে গিয়ে শেয়ারবাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি সুদের হার বাড়ালে ঋণের খরচও বেড়ে যায়। ফলে আবাসন, গাড়ি, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের চাহিদা কমতে পারে।

ভারতের ক্ষেত্রেও অপরিশোধিত তেলের দাম বড় উদ্বেগের কারণ। কারণ, দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি বিল বাড়ে এবং দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ও মুদ্রার উপর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি করা জ্বালানির দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়ে।

রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-র সমীক্ষা সংক্রান্ত দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে ভারতের মুদ্রাস্ফীতির সূচকে প্রায় ২০ বেসিস পয়েন্টের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে তেলের বাজারের ওঠানামা ভারতের আর্থিক নীতি নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে বলেই যে নিশ্চিত ভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা আসছে, এমনটা বলা যায় না। মন্দা নির্ভর করে দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ভোক্তা চাহিদা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতির উপর। তেলের দাম কত দিন উচ্চস্তরে থাকে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহণে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। কিন্তু যুদ্ধবিরতি বা সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে তেলের দাম ফের কমার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই এই মুহূর্তে মন্দা নিশ্চিত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর বদলে বিশ্ববাজারের পরবর্তী গতিবিধির দিকে নজর রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, হরমুজের পর বাব এল-মান্দেবকে ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের উপরে থাকে, তা হলে মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার, বিনিয়োগ এবং ভোক্তা চাহিদার উপর চাপ বাড়তে পারে। ভারতের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আপাতত তেলের দাম ১০৮ ডলার ছোঁয়াকে বিশ্বব্যাপী মন্দার নিশ্চিত সংকেত না বলে, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসাবেই দেখা হচ্ছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন