ক্যানসার শরীরে কোথায় লুকিয়ে রয়েছে, তা সবসময় সহজে বোঝা যায় না। বিশেষ করে চিকিৎসার পরেও শরীরে অতি সামান্য ক্যানসার কোষ থেকে গেলে তা পরবর্তী সময়ে ফের সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এবার এমনই ‘মলিকিউলার রেসিডুয়াল ডিজিজ’ বা চিকিৎসার পর শরীরে থেকে যাওয়া ক্যানসারের সূক্ষ্ম চিহ্ন খুঁজে বের করতে দেশে চালু হয়েছে একটি নতুন রক্ত পরীক্ষা।
এই পরীক্ষার নাম ‘মলিকিউলার রেসিডুয়াল ডিজিজ ব্লাড টেস্ট’ বা MRD। সংশ্লিষ্ট সংস্থার দাবি, রক্তে থাকা ক্যানসার-সম্পর্কিত DNA-র অতি ক্ষুদ্র পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে শরীরে ক্যানসার কোষের অবশিষ্টাংশ রয়েছে কি না, তার ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ টিউমার বড় আকার নেওয়ার আগেই আণবিক স্তরে তার চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করবে এই প্রযুক্তি।
চিকিৎসার পর ক্যানসার সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে বলে মনে হলেও কখনও কখনও শরীরে অতি সামান্য সংখ্যক ক্যানসার কোষ থেকে যেতে পারে। প্রচলিত ইমেজিং পরীক্ষায় সেই ক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশ সবসময় ধরা পড়ে না। পরে সেই কোষগুলি সক্রিয় হয়ে ক্যানসার ফিরে আসার কারণ হতে পারে। MRD পরীক্ষার মূল লক্ষ্যই হল এই অবশিষ্ট ক্যানসার কোষের চিহ্ন খুঁজে বের করা।
কী ভাবে কাজ করবে নতুন পরীক্ষা?
ক্যানসার কোষের DNA-তে স্বাভাবিক কোষের তুলনায় নির্দিষ্ট ধরনের জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন থাকতে পারে। সেই DNA-র কিছু অংশ রক্তে ভেসে বেড়ায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এগুলিকে বলা হয় ‘সার্কুলেটিং সেল-ফ্রি DNA’ বা cfDNA।
রক্তের নমুনা থেকে এই DNA সংগ্রহ করে তার জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দিষ্ট পরিবর্তন বা মিউটেশনের চিহ্ন মিললে শরীরে অবশিষ্ট ক্যানসার কোষ থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে চিকিৎসকেরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে পারেন।
এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হল, এখানে শুধু টিউমারের আকার বা অবস্থান দেখার বদলে ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া হয়। ফলে চিকিৎসার পরে রোগীর শরীরে ক্যানসারের অতি সামান্য অবশিষ্টাংশ রয়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সংস্থার দাবি অনুযায়ী, ‘অনকোট্র্যাক এমআরডি’ নামে এই পরীক্ষাটি স্তন, কোলন, ফুসফুস, ডিম্বাশয়, প্রস্টেট এবং অগ্ন্যাশয়ের মতো কয়েকটি ক্যানসারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।
গবেষকদের দাবি, পরীক্ষাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। রক্তের বিপুল সংখ্যক DNA-র মধ্যে ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত অতি অল্প পরিমাণ জিনগত সংকেতও শনাক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে এই প্রযুক্তির। ফলে চিকিৎসার পর ক্যানসার ফেরার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণেও এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কারা এই পরীক্ষা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন?
পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ক্যানসারের ঝুঁকি মূল্যায়নে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। তবে MRD পরীক্ষা মূলত চিকিৎসা-পরবর্তী পর্যায়ে ক্যানসার অবশিষ্ট রয়েছে বা ফেরার ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে বেশি প্রাসঙ্গিক।
স্তন, কোলন, ফুসফুস, প্রস্টেট, ডিম্বাশয় বা অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে কিংবা চিকিৎসা শেষ হয়েছে—এমন রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী এই ধরনের পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রক্তের এই পরীক্ষায় কোনও জিনগত সংকেত পাওয়া গেলেই যে নিশ্চিত ভাবে ক্যানসার হয়েছে বা ক্যানসার ফিরে এসেছে, এমন নয়। আবার পরীক্ষায় সংকেত না মিললেও ক্যানসার একেবারেই নেই—এমন নিশ্চয়তাও দেওয়া যায় না। রিপোর্টের ফলাফল রোগীর ক্যানসারের ধরন, চিকিৎসার ইতিহাস এবং অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে চিকিৎসককেই ব্যাখ্যা করতে হবে।
ক্যানসারের চিকিৎসায় তাই PET-CT, MRI, বায়োপসি বা অন্যান্য প্রচলিত পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে নয়, বরং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আরও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবেই এই নতুন রক্ত পরীক্ষাকে দেখা হচ্ছে। চিকিৎসার পর শরীরে লুকিয়ে থাকা অতি সামান্য ক্যানসার কোষের চিহ্ন দ্রুত শনাক্ত করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই নজরে।



