ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান-আমেরিকা সংঘাতের মধ্যেই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় বার্তা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। তাঁর দাবি, আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই ইরান যুদ্ধ শেষ হয়ে যেতে পারে। বুধবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, তাঁর মনে হয় নির্বাচনের পরেই যুদ্ধ শেষ হবে, কারণ ইরান আর বেশি দিন টিকে থাকতে পারবে না। তবে মার্কিন প্রশাসনের অন্দরেই এই সময়সীমা নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, ইরান আমেরিকার নির্বাচনে প্রভাব ফেলার মরিয়া চেষ্টা করছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, যুদ্ধের সামরিক পরিণতির পাশাপাশি আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনও এখন সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হয়ে উঠেছে। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনকে সামনে রেখে ইরান যুদ্ধ এবং তার আর্থিক প্রভাব ইতিমধ্যেই আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলছে না তাঁর প্রশাসনের শীর্ষস্তরের মূল্যায়ন। ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (JD Vance), বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিয়ো (Marco Rubio)-সহ ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টারা আশঙ্কা করছেন, সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। এমনকি ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদের শেষ পর্যন্তও যুদ্ধ গড়াতে পারে বলে তাঁদের তরফে সতর্ক করা হয়েছে।
এর মধ্যেই সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর আমেরিকা পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করার কথা জানায়। তার পরেই ইরান জর্ডনে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত একটি ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। জর্ডনের সেনাবাহিনীর দাবি, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র আটকেছে এবং হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। হরমুজ প্রণালীর কাছে জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ফের ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণপথগুলির অন্যতম হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় আমেরিকা-সহ বহু দেশের অর্থনীতিতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের সামরিক খরচও ইতিমধ্যে বিপুল। আমেরিকার সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতের প্রথম ১০০ ঘণ্টাতেই ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে আনুমানিক ৩.৭ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থায় আনুমানিক ১.৭ বিলিয়ন ডলার এবং আকাশপথে অভিযান পরিচালনায় প্রায় ১২৫ মিলিয়ন ডলার খরচের হিসাব দেওয়া হয়েছিল।
তবে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, খরচের হিসাবও আরও বেড়েছে। CSIS-এর পরবর্তী আপডেটে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়, প্রথম ছয় দিনেই যুদ্ধের খরচ প্রায় ১১.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু সামরিক ব্যয় নয়, অস্ত্রের মজুত, জ্বালানির দাম এবং সামগ্রিক অর্থনীতির উপরও চাপ বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ‘নির্বাচনের পর যুদ্ধ শেষ’ করার বার্তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে তিনি দ্রুত সংঘাতের অবসানের সম্ভাবনার কথা বলছেন, অন্যদিকে তাঁর প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের একাংশ দীর্ঘ যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহে ইরান-আমেরিকা সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয় এবং নভেম্বরের নির্বাচনের আগে কূটনৈতিক সমাধানের কোনও পথ তৈরি হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।



