সপ্তাহের শুরু থেকেই দুর্বল ভারতীয় শেয়ার বাজার। বুধবারও সেই পতনের ধারা কাটল না। দিনের লেনদেনে সেনসেক্স (Sensex) প্রায় ৬০০ পয়েন্ট নেমে ৭৪,৯৬৯-এর ঘরে চলে যায়। নিফটি৫০ (Nifty 50)-ও প্রায় ১৫০ পয়েন্ট হারিয়ে ২৩,৫০০-এর নীচে নেমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা, অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রি এবং IT শেয়ারে বড় ধাক্কা—সব মিলিয়ে বাজারে তৈরি হয়েছে চাপের পরিবেশ।
বাজার পড়ায় বিএসই-তে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির সম্মিলিত বাজারমূল্য একদিনে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা কমেছে। সেনসেক্সের বড় পতনগুলির মধ্যে ছিল তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির শেয়ার। ইনফোসিস (Infosys), HCL Tech, Tech Mahindra এবং TCS-এর দর প্রায় ৩ শতাংশ করে কমেছে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের (Reliance Industries) শেয়ারও প্রায় ১ শতাংশ নেমেছে।
তবে সব শেয়ারে একই ছবি দেখা যায়নি। Larsen & Toubro, Sun Pharma এবং NTPC-র শেয়ারে প্রায় ১ শতাংশ করে বৃদ্ধি হয়েছে। বৃহত্তর বাজারেও অবশ্য স্বস্তির ছবি নেই। Nifty Midcap 100 এবং Nifty Smallcap 100—দুই সূচকই প্রায় ০.৪ শতাংশ পর্যন্ত নেমেছে।
সেক্টরভিত্তিক সূচকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ ছিল IT-তে। Nifty IT প্রায় ৩ শতাংশ পড়েছে। অন্যদিকে Nifty Metal ও Nifty Pharma-সহ কয়েকটি সূচকে সামান্য উত্থান দেখা গিয়েছে। NSE-র পরিসংখ্যানও বাজারের দুর্বলতার ছবি স্পষ্ট করছে—১,৬৬০টি শেয়ারের দর কমেছে, বেড়েছে ১,১৫০টির। ১১০টি শেয়ারে কোনও পরিবর্তন হয়নি।
পশ্চিম এশিয়ায় ফের উত্তেজনা
বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ানোর অন্যতম কারণ পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি। মঙ্গলবার ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর সৌদি আরবের কয়েকটি জায়গায় হামলার খবর সামনে আসে। এরপর আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে। ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডের তরফে উপসাগরে মার্কিন জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার দাবি করা হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে দূরে থাকতে চান। ফলে শেয়ার বাজারে বিক্রির চাপ বাড়তে পারে। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে।
ফের ১০০ ডলারের কাছে অপরিশোধিত তেল
সংঘাতের আঁচ পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম ফের ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর আগে চলতি বছরে সংঘাতের তীব্র পর্যায়ে তেলের দাম প্রায় ১৩০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। পরে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলে দাম ৯০ ডলারের নীচে নেমে আসে।
ভারত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। ফলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি খরচ, সংস্থাগুলির উৎপাদন ব্যয় এবং দেশের বাণিজ্য ঘাটতির উপর চাপ পড়তে পারে। সেই আশঙ্কাও বাজারের মনোভাবে প্রভাব ফেলছে।
IPO-তে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের টাকা
বাজারে চাপের আর একটি কারণ হিসেবে উঠে আসছে IPO বা Initial Public Offering। বুধবার একসঙ্গে ছয়টি বড় IPO-তে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য সাবস্ক্রিপশন শুরু হয়েছে—Rentomojo, Karamtara Engineering, LCC Projects, Steamhouse India, Manipal Payment & Identity Solutions এবং Asset Reconstruction।
সাম্প্রতিক সময়ে IPO বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ায় সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে কিছু অর্থ প্রাথমিক বাজারে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জিওজিৎ ইনভেস্টমেন্টের চিফ ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট ভি কে বিজয়কুমারের মতে, IPO বাজারের শক্তিশালী বৃদ্ধি শেয়ার বাজারের তারল্য টেনে নিচ্ছে এবং তার ফলে নিফটির উপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি হচ্ছে।
IT শেয়ারে একের পর এক ধাক্কা
বুধবারের বাজার পতনে IT সেক্টরের ভূমিকা বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। Nifty IT প্রায় ৩ শতাংশ নেমেছে। Coforge-এর শেয়ারে প্রায় ৯ শতাংশের বড় পতন দেখা গিয়েছে। একই সঙ্গে Infosys, TCS এবং Tech Mahindra-সহ একাধিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার শেয়ারে বিক্রির চাপ ছিল।
বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, সংস্থাগুলির ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে সংশয় এবং উচ্চ মূল্যায়ন—এই ধরনের বিষয় IT শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তুলতে পারে। বুধবার সেই সতর্কতারই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে বাজারে।
ডলারের কাছে আরও দুর্বল টাকা
শেয়ার বাজারের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও উদ্বেগ রয়েছে। ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকা আরও দুর্বল হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে এক ডলারের দাম ৯৪.৮৮ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি টাকার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে বলে বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রি অব্যাহত
ভারতীয় বাজারে Foreign Institutional Investors বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রির প্রবণতাও এখনও থামেনি। মঙ্গলবার NSE-র প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ১২৩ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। একদিনের অঙ্ক খুব বড় না হলেও ধারাবাহিক বিক্রির ফলে বাজারে তার প্রভাব পড়ছে।
চলতি মাসে এখনও পর্যন্ত ছয়টি ট্রেডিং সেশনের মধ্যে চার দিনই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারে net seller ছিলেন। ফলে বিদেশি অর্থের বহিঃপ্রবাহ, দুর্বল টাকা, চড়া তেলের দাম এবং ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—এই চারটি চাপ একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে বাজারকে।
সব মিলিয়ে বুধবারের পতন কোনও একটি কারণের ফল নয়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি থেকে শুরু করে তেলের দাম, IPO-তে তারল্য সরে যাওয়া, IT শেয়ারে বিক্রি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক চাপ—একাধিক কারণ একসঙ্গে বাজারকে নীচের দিকে ঠেলেছে। আগামী দিনে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণই বাজারের পরবর্তী দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



