একসময় সিনেমা দেখতে হলে পাড়ার মোড় পেরিয়ে সোজা পৌঁছে যাওয়া যেত ‘মিনার’, ‘বিজলী’, ‘ছবিঘর’, ‘রূপবাণী’, ‘এলিট’ কিংবা ‘রক্সি’-র মতো প্রেক্ষাগৃহে। বড় পর্দায় বাংলা ছবি, ইন্টারভ্যালে বাদাম-চানাচুর আর শো শুরুর আগে টিকিটের লাইনে উপচে পড়া ভিড়—সিঙ্গেল স্ক্রিন শুধু সিনেমা দেখার জায়গা ছিল না, বাঙালির শহর ও মফস্সলের সামাজিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। কিন্তু সেই ছবি এখন কার্যত অতীত। পশ্চিমবঙ্গে একসময় ৭০০-র বেশি সিঙ্গেল স্ক্রিন ছিল বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সেই সংখ্যা প্রায় ১৩০-তে নেমে আসার কথা বলা হয়েছে।
তবে সংখ্যার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ফিল্ম ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার তথ্যভান্ডারে পশ্চিমবঙ্গে ৩৩০টি সিঙ্গেল স্ক্রিনের হিসাব পাওয়া যায়। আবার ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় রাজ্য সরকারের ২০২২ সালের নথি উদ্ধৃত করে সক্রিয় সিঙ্গেল স্ক্রিনের সংখ্যা ১৩১ বলা হয়েছে এবং গবেষকদের মাঠ-সমীক্ষায় ২০২৫ সালে তা ১৭১-এ দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ ‘কতগুলি হল রয়েছে’—তার হিসাব নির্ভর করছে কোন বছর, কোন সংজ্ঞা এবং কোন উৎস ব্যবহার করা হচ্ছে তার উপর।
কিন্তু সংখ্যা নিয়ে এই পার্থক্য যাই থাকুক, একটা বাস্তবতা নিয়ে দ্বিমত নেই—গত কয়েক দশকে বাংলার একপর্দার সিনেমা হলের সংখ্যা ভয়াবহ ভাবে কমেছে। আর তার সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়েছে জেলা ও মফস্সলের দর্শকদের উপর। কলকাতায় কোনও ঐতিহ্যবাহী হল বন্ধ হলে খবর হয়, কিন্তু ছোট শহর বা গ্রামে একটি সিনেমা হলের ঝাঁপ পড়লে অনেক সময় সেটি স্থানীয় মানুষের স্মৃতির মধ্যেই হারিয়ে যায়।
কেন একের পর এক বন্ধ হচ্ছে সিনেমা হল?
সিঙ্গেল স্ক্রিনের এই সংকটের পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। মাল্টিপ্লেক্সের উত্থান, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা, দর্শকের বিনোদনের অভ্যাস বদলে যাওয়া, রক্ষণাবেক্ষণের বাড়তি খরচ এবং পর্যাপ্ত ব্যবসা না পাওয়া—সব মিলিয়েই পুরনো হলগুলির উপর চাপ বেড়েছে।
এর সঙ্গে রয়েছে প্রেক্ষাগৃহের পরিকাঠামো আধুনিক করার খরচ। পুরনো হলকে নতুন করে সাজাতে গেলে আসন, শব্দ, পর্দা, প্রজেকশন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। অনেক হল মালিকের পক্ষে সেই বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়নি।
আর একটি বড় সমস্যা হল পর্যাপ্ত নতুন ছবি ও দর্শক। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলকাতার প্রিয়া সিনেমা ও বিনোদিনী তথা স্টার থিয়েটার সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার সময়ও হল কর্তৃপক্ষের তরফে কম দর্শক এবং নতুন বাংলা ছবির অভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
শুধু মাল্টিপ্লেক্স দিয়ে কি সমাধান হবে?
বাংলার সিনেমা হলের সংখ্যা কমতে কমতে এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে শুধু মাল্টিপ্লেক্স দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কলকাতা ও কয়েকটি বড় শহরে আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স তৈরি হলেও জেলার বহু এলাকায় এখনও সহজে পৌঁছনোর মতো প্রেক্ষাগৃহ নেই।
২০২৬ সালের একটি গবেষণায় কলকাতায় মাত্র ২৬টি সক্রিয় সিঙ্গেল স্ক্রিন এবং ২৪টি মাল্টিপ্লেক্স থাকার হিসাব দেওয়া হয়েছে। একই গবেষণায় বলা হয়েছে, কলকাতায় একসময় থাকা বহু একপর্দার হল ইতিমধ্যেই বন্ধ, ভেঙে ফেলা বা অন্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
ফলে প্রশ্নটা শুধু ‘সিঙ্গেল স্ক্রিন বনাম মাল্টিপ্লেক্স’ নয়। আসল প্রশ্ন হল—সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে কতগুলি সিনেমার পর্দা রয়েছে?
একটি ২০০-৩০০ টাকার মাল্টিপ্লেক্সের টিকিট অনেক পরিবারের নিয়মিত সিনেমা দেখার পথে বাধা হতে পারে। অথচ সিঙ্গেল স্ক্রিনে তুলনামূলক কম দামে ছবি দেখার সুযোগ থাকত। তাই সিঙ্গেল স্ক্রিনের প্রত্যাবর্তন মানে শুধু পুরনো দিনের নস্ট্যালজিয়া ফিরিয়ে আনা নয়, বরং সিনেমাকে আরও বেশি মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসাও।
বাংলা ছবির জন্যও বড় সমস্যা
সিনেমা হল কমে যাওয়ার সঙ্গে বাংলা ছবির বাজারও সরাসরি যুক্ত। একটি ছবি তৈরি হওয়ার পর সেটি দর্শকের কাছে পৌঁছতে হলে পর্যাপ্ত স্ক্রিন দরকার। কিন্তু স্ক্রিনের সংখ্যা কমলে নতুন ছবির প্রদর্শনের সুযোগও কমে যায়।
এই কারণেই ২০২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করেছিল। রাজ্যের সব সিনেমা হল এবং মাল্টিপ্লেক্সের প্রতিটি স্ক্রিনে প্রতিদিন অন্তত একটি বাংলা ছবি প্রাইম টাইমে দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়। প্রাইম টাইম হিসেবে ৩টে থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ বছরে প্রতিটি স্ক্রিনে অন্তত ৩৬৫টি বাংলা ছবির শো রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ছবিকে পর্যাপ্ত প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে শুধু শো বরাদ্দ করলেই দর্শক পাওয়া যায় না। ছবির মান, প্রচার, টিকিটের দাম, দর্শকের পছন্দ এবং হলের পরিকাঠামো—সবকিছুর উপরই ব্যবসা নির্ভর করে।
এমনকি এই নীতির পরে সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলির একাংশ আর্থিক চাপের কথাও জানিয়েছিল। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে ২কে প্রজেকশনের ভার্চুয়াল প্রিন্ট ফি-র বাড়তি খরচ এবং কম টিকিট বিক্রির কারণে ছোট হলগুলির সমস্যার কথা উঠে আসে।
সরকারের নতুন উদ্যোগ ‘মিনি সিনেমা’
তবে একেবারে কোনও উদ্যোগ নেই, এমনটা বলা যাবে না। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যেই West Bengal Mini Cinema Policy 2025 চালু করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই নীতির অধীনে ছোট আকারের সিনেমা হল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর মিনি-সিনেমা হল স্থাপনের জন্য সংস্থাগুলির কাছ থেকে Expression of Interest-ও চেয়েছে।
এই মিনি সিনেমা হলগুলিতে সর্বোচ্চ ৫০টি আসন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বড় প্রজেকশন রুমের পরিবর্তে ডিজিটাল ডিসপ্লে এবং তুলনামূলক কম পরিকাঠামোয় ছবি দেখানোর ব্যবস্থা থাকবে। বিশেষ করে শহরতলি ও গ্রামীণ এলাকায় ছোট জায়গায় সিনেমা দেখার সুযোগ তৈরি করাই এই নীতির অন্যতম লক্ষ্য।
অর্থাৎ সরকারও বুঝতে পারছে, আগামী দিনে ৭০০ আসনের পুরনো হল ফিরিয়ে আনা সব জায়গায় সম্ভব নয়। তার বদলে ছোট, আধুনিক এবং কম খরচে চালানো যায়—এমন প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বাড়ানোই বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে।
কলকাতায় ২০০ হল ফিরবে কী ভাবে?
তাহলে কলকাতায় আবার ২০০-র বেশি সিনেমা হল ফিরিয়ে আনার দাবি কতটা বাস্তবসম্মত? পুরনো প্রতিটি হল হুবহু ফিরিয়ে আনা হয়তো সম্ভব নয়। অনেক জায়গায় জমি অন্য কাজে ব্যবহার হয়েছে, কোথাও বহুতল তৈরি হয়েছে, কোথাও হলের কাঠামোই আর নেই।
কিন্তু বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রেক্ষাগৃহের জায়গায় নতুন করে ছোট বা মাঝারি আকারের সিনেমা হল তৈরি করা সম্ভব। পুরনো হলগুলিকে কর-ছাড়, সংস্কারের জন্য সহজ ঋণ, অগ্নিনিরাপত্তা ও লাইসেন্স সংক্রান্ত দ্রুত অনুমোদন এবং প্রযুক্তি আধুনিকীকরণে আর্থিক সহায়তার মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে জেলা ও মফস্সলের জন্য আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ কলকাতায় মাল্টিপ্লেক্স থাকলেও বহু জেলার মানুষ এখনও কাছাকাছি বড় পর্দার অভাবে সিনেমা দেখার অভ্যাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সিনেমা হলকে শুধু ছবি দেখানোর ব্যবসা হিসেবে না দেখে স্থানীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে ভাবা। সিনেমার পাশাপাশি ছোট অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র উৎসব, স্কুল-কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা স্থানীয় শিল্পীদের অনুষ্ঠান করার সুযোগ থাকলে সারা বছর হল চালু রাখার সম্ভাবনাও বাড়বে।
সরকারের কাছে তাই একটাই দাবি
বাংলার সিঙ্গেল স্ক্রিন ফিরিয়ে আনার লড়াই আসলে শুধু পুরনো সিনেমা হলের লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা ছবির ভবিষ্যৎ, সাধারণ দর্শকের বিনোদনের অধিকার এবং বহু দশকের একটি সাংস্কৃতিক পরম্পরা।
তাই ‘৭০০ থেকে ১৩০’—এই সংখ্যার প্রতীকী পতনের জায়গায় এবার উল্টো যাত্রা শুরু করার সময় এসেছে। পুরনো হল যেখানে সম্ভব সেখানে ফিরুক, যেখানে সম্ভব নয় সেখানে তৈরি হোক ছোট আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ। কলকাতা থেকে জেলা—প্রতিটি এলাকার মানুষের নাগালের মধ্যে সিনেমা দেখার সুযোগ তৈরি হোক।
সরকারের কাছে দাবি একটাই—বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলিকে ফিরিয়ে আনার জন্য নির্দিষ্ট পুনরুজ্জীবন নীতি তৈরি হোক। কলকাতায় শুধু কয়েকটি বড় মাল্টিপ্লেক্স নয়, ২০০-র কাছাকাছি বা তার বেশি সহজলভ্য সিনেমা পর্দা তৈরির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হোক। আর সেই পর্দায় বাংলা ছবি দেখার সুযোগও নিশ্চিত করা হোক। কারণ সিনেমা হল হারিয়ে গেলে শুধু একটি ব্যবসা বন্ধ হয় না—হারিয়ে যায় একটি শহর, একটি পাড়া এবং কয়েক প্রজন্মের স্মৃতির অংশ।



