নজরবন্দি ব্যুরো: সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)-এর নির্দেশে ২০১৬ সালের নিয়োগে ‘যোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত প্রায় ১৭ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি ২০২৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বহাল থাকছে। নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য রাজ্য ও স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC)-কে এই সময়সীমা দেওয়া হলেও, আদালতের নির্দেশে স্বস্তির পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও কাটছে না শিক্ষকদের। হুগলির শিক্ষক সুমন বিশ্বাসের প্রশ্ন, “বেতন না পেলে খাব কী?” রায়গঞ্জের শিক্ষিকা কৃষ্ণ মৃত্তিকা নাথের কথায়, “জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।”
সুমন বিশ্বাসের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মানসিক চাপে রয়েছেন তাঁরা। তাঁর কথায়, “যতই মানসিক শক্তি থাকুক, বেতন না পেলে খাব কী?” তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আপাতত চাকরি বহাল থাকায় তিনি মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন।
তবে সুমনের দাবি, এই সাময়িক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ২০১৬ সালের প্যানেলে যাঁরা বৈধভাবে চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁদের চাকরি স্থায়ীভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। তাঁর প্রশ্ন, গত এক বছরে যদি কোনও যোগ্য শিক্ষককে ‘টেইন্টেড’ হিসেবে চিহ্নিত করা না হয়ে থাকে, তাহলে শুধুমাত্র নিয়োগ প্রক্রিয়ার সামগ্রিক বিতর্কের কারণে যোগ্যদের চাকরি কেন অনিশ্চিত থাকবে?
সুমনের আরও বক্তব্য, ২০১৬ সালের নিয়োগে এমন কিছু বিষয়েও শিক্ষক নিয়োগ হয়েছিল, যেগুলি পরবর্তী সময়ে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সেই বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি চাকরির অনিশ্চয়তার মধ্যে যেসব শিক্ষক মারা গিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবিও সামনে এনেছেন তিনি।
অন্যদিকে রায়গঞ্জের দেবীনগর কে.সি.আর বিদ্যাপীঠের শিক্ষিকা কৃষ্ণ মৃত্তিকা নাথের বক্তব্যে ক্ষোভ আরও স্পষ্ট। ‘সাময়িক স্বস্তি’ শব্দবন্ধেই তাঁর আপত্তি। কারণ, তাঁর কাছে এই নির্দেশের অর্থ এখনও স্থায়ী নিশ্চয়তা নয়—বরং আরও কয়েক মাসের জন্য চাকরি বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ।
কৃষ্ণ মৃত্তিকার কথায়, চাকরি স্থায়ীভাবে ফিরিয়ে না দিলে ফের পথে নেমে আন্দোলন করতে হবে। তাঁর আবেদন, সিস্টেমের কাছে যেন যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্রুত এবং মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা শিক্ষকদের পরিবারগুলির উপরও এর গভীর প্রভাব পড়ছে।
এদিকে ২৬ হাজার শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর চাকরি বাতিলের পর নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। সেই প্রক্রিয়া ৩১ অগস্টের মধ্যে শেষ করা সম্ভব নয় বলে রাজ্য ও স্কুল সার্ভিস কমিশন অতিরিক্ত সময় চেয়েছিল। সেই আবেদন মেনে সুপ্রিম কোর্ট ২০২৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত সময় দিয়েছে।
আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছে, ৩১ মে ২০২৭-ই শেষ সময়। এর মধ্যে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে। নবম-দশম, একাদশ-দ্বাদশ-সহ সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার দায়িত্ব এখন রাজ্য ও এসএসসির উপর। নতুন নিয়োগ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত যোগ্য হিসেবে বিবেচিত প্রায় ১৭ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা চাকরিতে বহাল থাকবেন।
ফলে আদালতের নির্দেশে আপাতত চাকরি হারানোর তাৎক্ষণিক আশঙ্কা কমলেও শিক্ষকদের মূল দাবি এখনও একই—স্থায়ীভাবে চাকরি ফেরত চাই। আগামী কয়েক মাসে রাজ্য ও এসএসসি কীভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যায়, তার উপরই নির্ভর করছে এই ১৭ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার পরবর্তী ভবিষ্যৎ। আর সেই কারণেই আজকের স্বস্তির মধ্যেও তাঁদের কণ্ঠে থেকে যাচ্ছে একই প্রশ্ন—চাকরি কি সত্যিই ফিরবে, নাকি আবারও শুরু হবে অনিশ্চয়তার দিন?



